ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তিত বেগুনে টমেটো জোড়া লাগিয়ে কমলগঞ্জে সফল গ্রাফটিং

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
তিত বেগুনে টমেটো জোড়া লাগিয়ে কমলগঞ্জে সফল গ্রাফটিং ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অভিনব এবং আধুনিক এক কৌশলে টমেটোর চারা উৎপাদন করা হচ্ছে, যা বর্তমানে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিত বেগুনের উদ্ভিদের সঙ্গে টমেটোর গাছ জুড়ে দিয়ে এই বিশেষ ধরনের চারা প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।

পদ্ধতিটির শুরুতে তিত বেগুন বা বনবেগুনের উদ্ভিদের শক্ত শিকড়ের অংশ রেখে ওপরের দিকে টমেটোর অংশ নিখুঁতভাবে কেটে একত্রিত করা হয়। এরপর সংযোগস্থলটি পলিথিন দিয়ে মুড়ে বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুটি অংশ স্থায়ীভাবে জোড়া লাগানো হয়।

সংযুক্তির পর চারাগুলো আরও ১০ থেকে ১২ দিন নিবিড় যত্নে রেখে পূর্ণ শক্ত করে তোলা হয়। সারা বছরই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে এবং এভাবে উৎপাদিত চারাগুলো দেশের নানা প্রান্তে পাঠানো হয়।

কমলগঞ্জ কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই উপজেলার আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও এবং নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এই চারা তৈরির কাজ ব্যাপকভাবে চলছে। এখানকার নার্সারিগুলোতে কারিগর ও চাষিরা অত্যন্ত ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন।

উৎপাদনের পর এই চারাগুলো কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও হবিগঞ্জসহ দেশের অসংখ্য জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রির কাজ সম্পন্ন হয়।

প্রতিটি চারা সাধারণত ১২ থেকে ১৫ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হয়ে থাকে এবং এই খাতকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর সাত কোটি টাকার বেশি আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। কমলগঞ্জ অঞ্চলে বর্তমানে এ ধরনের প্রায় ৩০০টি নার্সারি গড়ে উঠেছে।

চলতি কৃষি মৌসুমে এই উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ এবং গ্রাফটিং চারার নার্সারি পরিচালিত হয়েছে। স্থানীয় চাষিদের তথ্যমতে, এই শিল্পের সঙ্গে বর্তমানে প্রায় এক হাজার চাষি সরাসরি যুক্ত রয়েছেন এবং এই সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোপ্রাকিবুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান যে, গ্রাফটিং করা টমেটোর গাছ সাধারণ উদ্ভিদের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত হয় এবং সহজে হেলে পড়ে না। সাধারণ টমেটোগাছ যেখানে মাত্র তিন মাস বেঁচে থাকে, সেখানে গ্রাফটিং করা গাছ প্রায় আট মাস পর্যন্ত জীবনকাল লাভ করে।

এই চারাগুলোর রোগবালাইয়ের আক্রমণও অনেক কম হয়ে থাকে, যার ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এর ব্যাপক কদর রয়েছে। চাষিদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই চারা তৈরির জন্য প্রথমে তিত বেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা প্রস্তুত করা হয়।

একটি তিত বেগুনের চারা উপযুক্ত হতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা তৈরি হতে প্রায় ২৫ দিন সময় প্রয়োজন হয়। পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যবান ও সামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতির চারাগুলো বাছাই করে এই বিশেষ জোড়া লাগানোর কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

এই কাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা প্রতিটি চারা জোড়া লাগানোর বিপরীতে প্রায় এক টাকা করে পারিশ্রমিক পান। তাদের কাজের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা সফলভাবে জোড়া লাগাতে সক্ষম হন।

কমলগঞ্জের আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারি অ্যান্ড প্রোডাক্টসের কর্ণধার এম এ করিম অতীতে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি সেনাবাহিনীর একটি প্রকল্পের আওতায় রংপুরে গিয়ে এই গ্রাফটিং চারা তৈরির কলাকৌশল আয়ত্ত করেন।

সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর তিনি নিজ এলাকা কমলগঞ্জে এসে এই চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। তাঁর মতে, শুরুতে এলাকাবাসী এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত ছিল না, তবে পরবর্তীতে তাঁর দেখাদেখি বহু কৃষক এই পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছেন।

বর্তমানে তাঁর নার্সারিতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা উৎপাদিত ও বিক্রয় হয় এবং সেখানে প্রায় ৬০ জন শ্রমিক তিনটি শিফটে দিনরাত পরিশ্রম করছেন। দেশের দূরদূরান্ত থেকে কৃষকেরা এসে সরাসরি তাঁর নার্সারি থেকে এই চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

শ্রমিক সুমন মিয়া গ্রাফটিং পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে জানান যে, প্রতিটি চারা তৈরির জন্য তারা এক টাকা মজুরি পান এবং দৈনিক সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ চারা তৈরি করা যায়। অন্যান্য কাজের তুলনায় এখানে পারিশ্রমিক বেশি এবং পরিশ্রম কম হওয়ায় একবার যারা শেখে, তারা এই কাজ ছাড়ে না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার জানান, সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি তাঁর নজরে আসে এবং তিনি কয়েকটি উৎপাদন কেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। কৃষকেরা যাতে আরও উন্নত উপায়ে চারা উৎপাদন করতে পারেন এবং ক্রেতারা সহজে সংগ্রহ করতে পারেন, সে বিষয়ে সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ব্যালন ডিঅরের লালগালিচায় বাংলাদেশি ফুয়াদ আবদুল আজিজ

ব্যালন ডিঅরের লালগালিচায় বাংলাদেশি ফুয়াদ আবদুল আজিজ