ঢাকা | বঙ্গাব্দ

লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের সঙ্গে কাটানো কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 23, 2026 ইং
লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের সঙ্গে কাটানো কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

করোনা মহামারীর সেই কঠিন সময়ে হঠাৎ করেই একদিন টেলিভিশনের স্ক্রল থেকে জানা গেল, প্রাণবন্ত মানুষ সৈয়দ আবুল মকসুদ আর আমাদের মাঝে নেই। মাত্র দুদিনের জ্বর এবং শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, যা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল।

প্রয়াত এই প্রাবন্ধিকের সঙ্গে আমার জানাশোনা খুব দীর্ঘসময়ের ছিল না, বড়জোর সাত থেকে আট বছর। তবে একই সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত কলাম লেখালেখি এবং বিভিন্ন টেলিভিশন টক শোতে একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সুবাদে আমাদের মধ্যে এক ধরনের সখ্য গড়ে ওঠে।

আমাদের বাসাও ছিল কাছাকাছি এলাকায়, যার ফলে যাতায়াতের সময় প্রায়ই একই গাড়িতে আমাদের পথ চলা হতো। গাড়ির ভেতরের সেই নিভৃত আলাপে অনেক এমন প্রসঙ্গ উঠে আসত, যা জনসমক্ষে বা সংবাদপত্রে প্রকাশ করা সম্ভব হতো না।

একটি টক শো শেষ করে গভীর রাতে বাসায় ফেরার পথে গুলশান দুই নম্বর এলাকার চৌরাস্তার সিগন্যালে আমাদের গাড়িটি একবার আটকে পড়েছিল। সেই মুহূর্তে কর্তব্যরত একজন ট্রাফিক কনস্টেবল দ্রুত ছুটে এসে আমাদের গাড়ির জানালার কাচে টোকা দিলে মকসুদ ভাই কাচ নামান।

ওই পুলিশকর্মী তখন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সালাম জানিয়ে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রকাশ্যেই নিজের গভীর ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রতিবাদ জানানোর একটি নিজস্ব প্রতীকী মাধ্যম হিসেবে নিজের পোশাকের ধরণকে বেছে নিয়েছিলেন, যা ঢাকা শহরে তাঁকে সম্পূর্ণ আলাদা ও সহজে দৃশ্যমান করে তুলত।

তবে এই বিশেষ পোশাকের একটি ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা ছিল যে, এতে কোনো পকেট না থাকায় তাঁর পক্ষে টাকা-পয়সা বা মোবাইল ফোন কাছে রাখা সম্ভব হতো না এবং তিনি সম্পূর্ণ কপর্দকহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াতাম।

সারাদেশে তাঁর পরিচিতি ছিল মূলত তাঁর সিগনেচার পোশাকের কারণে, যার পুরোটাই থাকত সাদা কাপড়ে মোড়া এবং আমরা অনেকেই কৌতুকের ছলে একে কাফনের কাপড় বলে উল্লেখ করতাম।

কেউ ঘুণাক্ষরেও তখন বুঝতে পারেনি যে, এই প্রতীকী সাদা কাফনের কাপড় এত দ্রুতই তাঁর নশ্বর শরীরে জড়িয়ে যাবে এবং তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যাবেন।

একদিন কৌতূহলী হয়ে আমি তাঁকে বলেছিলাম যে আমিও ঠিক তাঁর মতো একই রকম পোশাক পরিধান করার কথা চিন্তা করছি, তবে তা সাদা রঙের হবে না।

কারণ সাদা রঙের পোশাক পরলে চারপাশের সবাই নিশ্চিতভাবেই ধরে নেবে যে আমি জ্যেষ্ঠ এই লেখককে অন্ধের মতো অনুকরণ বা নকল করার চেষ্টা করছি।

তখন তিনি আমাকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে আমি যেন ভুলেও এই কাজটি না করি কারণ এই পোশাকে প্রচণ্ড গরম লাগে এবং তিনি নিজেও এখন তা আর বদলাতে পারছেন না।

নতুন লেখক হিসেবে সে সময় আমার মাত্র একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল এবং কাকতালীয়ভাবে সেই বইটি দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করায় একুশে বইমেলার পরিবেশ ছিল বেশ উৎসবমুখর।

বুকের ভেতর কাঁপন নিয়ে আমি প্রকাশকের নির্দিষ্ট স্টলে গিয়ে চুপচাপ বসেছিলাম, কারণ তখনো সাধারণ পাঠকদের কাছে আমার কোনো চেনা মুখ বা পরিচিতি ছিল না।

সে সময় মকসুদ ভাই আমাকে সাহস জুগিয়ে বললেন যেন আমি সেখানে বসে থাকি, কারণ তাঁর সামনে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করার জন্য পাঠকদের দীর্ঘ লাইন দাঁড়িয়েছিল।

পাঠকরা দল বেঁধে তাঁর বইয়ের জন্য অটোগ্রাফ চাইলেও মজার বিষয় ছিল তাঁরা মূলত কিনে নিচ্ছিলেন আমার লেখা নতুন বইটিই।

আমাকে তখন কেউ চেন না দেখেও মকসুদ ভাই অত্যন্ত নির্বিকার চিত্তে হাসিমুখে আমার সেই প্রথম বইটিতেও অটোগ্রাফ স্বাক্ষর করে যাচ্ছিলেন।

তিনি মৃদু হেসে আমাকে উদ্দেশ করে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি দীর্ঘ এত বছর ধরে লিখেও আশানুরূপ কিছু করতে পারেননি, অথচ আমি প্রথম বই দিয়েই বাজিমাত করে দিয়েছি।

তাঁর সেই কথা শুনে আমি যেমন বিস্মিত হয়েছিলাম, তেমনি কিছুটা লজ্জাও পেয়েছিলাম; পরে এক রাতে টক শো শেষে গাড়িতে ফেরার সময় তিনি আমাকে সোজা বাসায় না নিয়ে কলাবাগানের একটি বাড়িতে নিয়ে যান।

সেখানকার একটি দোতালা ঘরের ভেতর প্রবেশ করে বুকশেলফগুলো দেখিয়ে তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন যেন একটি নতুন পাঠাগার গড়ে তোলার কাজে আমি কিছু বই দিয়ে সহযোগিতা করি।

ইতিহাসের এক বিতর্কিত বিষয়ে একবার জনশ্রুতি ছিল যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নাকি পঁচাত্তরের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন জানিয়ে ঢাকায় একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন।

সে সময় অভ্যুত্থানকারীরা মওলানার মতো নেতার কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের কর্মকাণ্ডের বৈধতা বা ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছিল এবং আমি যখন মওলানা ভাসানীকে নিয়ে লেখালেখি শুরু করি, তখন আমি তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করি।

মকসুদ ভাই তখন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আমাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এই প্রচারণার পুরোটাই ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।

তিনি বলেন, সেই সংকটময় সময়ে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন, সুতরাং তিনি কীভাবে এবং কার কাছে সেই টেলিগ্রাম পাঠাবেন?

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বাবাসসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে এ ধরনের কোনো সংবাদ বাসস থেকে কখনোই পাঠানো হয়নি।

তিনি স্পষ্ট করে জানান যে এই কাল্পনিক টেলিগ্রামের গল্পটি মূলত বঙ্গভবনের অন্দরে বসে কিছু অভ্যুত্থানকারী তৈরি করেছিল এবং সে সময়কার বিভিন্ন পত্রিকা তা যাচাই না করেই ছেপেছিল।

সাংবাদিকতাকে নিজের প্রাথমিক কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেও তিনি কখনোই এর গণ্ডিবদ্ধ বা সীমিত পরিসরের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি, বরং একজন গভীর গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন।

তথ্য, যুক্তি এবং ইতিহাস সম্পর্কে প্রখর সচেতনতাই ছিল তাঁর কলমের মূল শক্তি এবং সমাজের সব ধরনের অসংগতির বিরুদ্ধে তিনি তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ ও স্যাটায়ার ফুটিয়ে তুলতেন।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ আছেন যাঁদের বহুমুখী পরিচয় কোনো একটি নির্দিষ্ট পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, আর সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন ঠিক তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।

সাংবাদিকতা বা কলামিস্ট পরিচয়ের চেয়েও তাঁর সাহসী মনস্তত্ত্ব এবং সত্যসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক বেশি প্রখর, যা সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির জটিল বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় উন্মোচন করত।

মানিকগঞ্জের এক নিভৃত ও শান্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশবেই নদী, মাঠ ও বাংলার সবুজ প্রকৃতির মাঝে দেশ ও মানুষের প্রতি যে গভীর টান অনুভব করেছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই শিকড়ের টান তাঁকে কখনো ছাড়েনি।

বাংলা ভাষায় গবেষণাধর্মী সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, মহাত্মা গান্ধী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মওলানা ভাসানী ও স্যার সলিমুল্লাহর জীবন ও কর্ম স্থান পেয়েছিল।

মওলানা ভাসানীকে নিয়ে তাঁর গবেষণা কেবল কতগুলো খণ্ডিত তথ্যের সমাবেশ ছিল না, বরং তা ছিল ইতিহাসের প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা।

তিনি মওলানা ভাসানীকে কোনো কল্পিত পৌরাণিক নায়ক হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং একজন আপাদমস্তক রাজনৈতিক নেতা ও গণমানুষের প্রতিনিধি হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

তিনি আমাদের বারবার এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন যে প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের মূল কাজ কখনোই ক্ষমতার স্তুতি গাওয়া বা প্রশংসা করা নয়, বরং যেকোনো মূল্যে সত্যকে অনুসরণ করা, তা যত অপ্রিয়ই হোক না কেন।

একজন প্রকৃত লেখকের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে তাঁর সমকালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গভীরতার ওপর, আর সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর সময়কে কেবল নীরব দর্শক হয়ে দেখেননি, বরং তাতে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

সমাজের প্রচলিত সব ধরনের অন্ধত্ব, ভ্রম এবং আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এই বিরল কণ্ঠস্বরের কলামগুলোতে তাই নৈতিক ক্ষোভ ও যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যেত।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মাথায় ফসলের বস্তা আর পিঠে ভার নিয়ে যমুনার চরে জীবনযুদ্ধ

মাথায় ফসলের বস্তা আর পিঠে ভার নিয়ে যমুনার চরে জীবনযুদ্ধ