ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্যারিসে অভিবাসীদের নিশানা করে হামলা, সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2026 ইং
প্যারিসে অভিবাসীদের নিশানা করে হামলা, সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত প্রাণঘাতী বন্দুক হামলাকে নির্দিষ্টভাবে একটি বর্ণবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ফরাসি ভূখণ্ডে জাতিগত পরিচিতিকে কেন্দ্র করে এর আগে এ ধরনের নির্বিচার ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

গতকালের শুক্রবারের প্রারম্ভিক সময়ে প্যারিসের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রাপেস শহরে একটি চলমান গাড়ি থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন অজ্ঞাত এক অস্ত্রধারী ব্যক্তি। এই ঘটনার ঠিক পরপরই তিনি সংলগ্ন লা ভেরিয়ের শহরেও একইভাবে অস্ত্র উঁচিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করেন।

প্রায় দীর্ঘ পনেরো মিনিট সময় ধরে চলা এই সহিংস হামলার পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিশানা করা হয়েছিল বলেই জোরালোভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করতে সক্ষম হন।

সংঘটিত এই গুলিবর্ষণের ঘটনায় সব মিলিয়ে একজন নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর জখম হয়েছেন আরও পাঁচজন সাধারণ মানুষ। আক্রান্তদের মধ্যে তিনজন ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে, যার মধ্যে ১২ বছর বয়সের একজন শিশুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ঘটনার পরপরই সরাসরি ঘটনাস্থল পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ট্রাপেস শহরে উপস্থিত হন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। পরিদর্শনের সময় তিনি গণমাধ্যম ও উপস্থিত লোকজনের সামনে মতামত ব্যক্ত করে জানান যে, সাধারণ মানুষের নির্দিষ্ট গায়ের চামড়ার রঙ এবং তাদের বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই মূল আক্রমণকারী তাঁদের সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলেন।

এই ধরনের উগ্র ও জঘন্য হামলার বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমানে বেশ কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন মতাদর্শ সমাজব্যবস্থার ভেতরে ধীরে ধীরে নিজেদের শিকড় শক্ত করে গেড়ে বসছে।

গত শুক্রবার সকালে প্যারিসের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত ট্রাপেস শহরে একটি মোটরযান থেকে আকস্মিকভাবে গুলি ছুড়তে শুরু করেন ওই ব্যক্তি। এরপর পার্শ্ববর্তী লা ভেরিয়ের শহরের বিভিন্ন পয়েন্টেও তিনি একইভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে গুলি চালান।

প্রায় কোয়ার্টার ঘণ্টা ব্যাপী স্থায়ী এই সশস্ত্র তাণ্ডবে অভিবাসীদের বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে সন্দেহভাজন হামলাকারীকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

রক্তাক্ত এই হামলার সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য বা মোটিভ এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে দেশটির জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ কৌঁসুলির দপ্তর পিএনএটি এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জানিয়েছে যে, পুরো ঘটনাটি সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত বলেই জোরালোভাবে মনে হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে এর পূর্ণাঙ্গ তদন্তও শুরু হয়েছে।

বিভিন্ন ফরাসি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা যায় যে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম কেভিন টি। পিএনএটির সংরক্ষিত তথ্যাদি অনুযায়ী, ইতিপূর্বে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাঁকে মোট চারটি ভিন্ন অপরাধের জন্য আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

তবে আইনি নিয়ম অনুযায়ী অতীতের সেই অপরাধের রেকর্ডগুলো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় তাঁর অপরাধের তালিকা থেকে চিরতরে মুছে গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন খবরে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, ৩৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন চিনলেও দেশের বড় কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি নজরদারির আওতায় তিনি ছিলেন না।

সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আরও স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, এই সন্দেহভাজন ব্যক্তি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুতর কোনো হুমকি হিসেবে পূর্বে চিহ্নিত ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। এই সন্ত্রাসী ঘটনার সূত্র ধরে গতকাল তাঁর পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক সদস্যকেও পুলিশ আটক করেছে।

ট্রাপেস শহরের মেয়র আলি রাবেহ সংবাদমাধ্যমের কাছে বর্ণনা করে জানান যে, গতকাল দিনের শুরুর ওই সময়ে এক ব্যক্তি চারদিকে গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বিভিন্ন সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে নির্বিচার গুলি ছুড়ছিলেন। হামলাকারী এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

মেয়রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর মূল উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব সাধারণ মানুষকে হতাহতের মুখে ফেলা এবং তিনি মূলত একটি বড় ধরনের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করার চক্রান্ত করেছিলেন।

ট্রাপেসের মেয়র আরও জানান যে, এই সহিংসতার ঘটনাটি শহরের একটি ব্যস্ত পেট্রলপাম্প, একটি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং শিশুদের একটি খেলার মাঠের অত্যন্ত কাছাকাছি এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল। এসব স্থান পেরিয়ে হামলাকারী পরবর্তীতে পাশের লা ভেরিয়ের শহরের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই এলাকা থেকেই তাঁকে অবশেষে আটক করা হয়।

গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হওয়া ১২ বছর বয়সী সেই কোমলমতি শিশুর মা ফরাসি বিশিষ্ট সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএলকে সাক্ষাৎকারে জানান যে, তাঁর অবুঝ মেয়ের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মোট আটটি গুলির মারাত্মক ক্ষতচিহ্ন রয়েছে এবং ইতিমধ্যে তাকে জটিল অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কোনো সুস্থ মানুষ একটি ছোট শিশুর সঙ্গে এমন পশুবৎ আচরণ করতে পারে কীভাবে?

আহত শিশুটির মা আরও জানান যে, ঘটনার সময় তাঁর সেই কন্যাশিশুটির মাথায় একটি স্কার্ফ পরিধান করা ছিল। ঠিক এই কারণে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল কি না, সেই গুরুতর প্রশ্নটিও জনসমক্ষে জোরালোভাবে তুলে ধরেন তিনি।

মমতাময়ী মায়ের ভাষায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তাঁর ওই মেয়েটি ফ্রান্সের মাটিতেই জন্মগ্রহণ করেছে। সুতরাং এই দেশের স্বাধীন ভূখণ্ডে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করার এবং নিজের সুন্দর জীবন গড়ার সম্পূর্ণ ও আইনগত অধিকার তার রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, সন্দেহভাজন ওই হামলাকারী একটি শক্তিশালী আধা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। মূলত এই বিশেষ ধরনের অস্ত্রটি দিয়ে খুব সহজে একসঙ্গে একাধিক বুলেট বা গুলি ছুড়ে আক্রমণ চালানো সম্ভব।

ফরাসি প্রভাবশালী দৈনিক সংবাদপত্র লে প্যারিসিয়াঁর প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, হামলাকারীর ব্যবহৃত ওই আগ্নেয়াস্ত্রটি মূলত ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের একটি পুরোনো অস্ত্র।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
গ্যাসের আগুনে দগ্ধ একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু

গ্যাসের আগুনে দগ্ধ একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু