ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি ভোট টানতে ট্রাম্পের সমর্থন ও ইরানের হুঁশিয়ারি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2026 ইং
ইসরায়েলি ভোট টানতে ট্রাম্পের সমর্থন ও ইরানের হুঁশিয়ারি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

আসন্ন মঙ্গলবার ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে ইসরায়েলি রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটার সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে আলোচনা চলছে।

সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের দল ইয়াশার প্রকাশিত বেশ কিছু জনমত জরিপে দেখা গেছে, তারা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে রয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে।

এমন সময়ে যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছিলেন, তখন তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভোটের তারিখের মাত্র ৯ দিন বাকি থাকতে ট্রাম্প তাঁকে তাঁর পূর্ণাঙ্গ ও নিঃশর্ত সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প এই প্রকাশ্য সমর্থন জানান। সাধারণত মিত্রদেশের ভেতরের নির্বাচনে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান না নেওয়ার দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি রয়েছে, যা ট্রাম্প এবার সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করলেন।

নেতানিয়াহুর প্রতি এই সমর্থনের পাশাপাশি ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে তেহরান যদি অবিলম্বে তাদের বর্তমান নীতি পরিবর্তন না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুতই এই বিষয়ের সুরাহা করবে বা কাজ শেষ করবে।

ইসরায়েলের ভোটারদের উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বার্তা দিয়েছেন যে নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে ওয়াশিংটনকে একা এই কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে, যা তিনি করতে ইচ্ছুক নন। এর মাধ্যমে ভোটের লড়াইয়ের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহযোগিতার বিষয়টিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি ভোটারদের রায়ের ওপর প্রভাব ফেলতে মার্কিন রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে এমন খোলামেলা হস্তক্ষেপের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বিশেষ বন্ধুত্বের জোরেই কেবল ইরানের হুমকি চিরতরে দূর করা সম্ভব।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য উপলব্ধি করে নেতানিয়াহু জনসমক্ষে তাঁকেই ভোট দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

The Jerusalem Post-এর সমকক্ষ দৈনিক হারেৎজ-এর ইংরেজি সংস্করণের সম্পাদক ইশাই হালপার অবশ্য বড় কোনো রাজনৈতিক পালাবদলের পূর্বাভাস দেখছেন না। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুকেই সমর্থন করেন, তা সবার জানা ছিল; তবে মূল চমকটি হলো এতদিন পর এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন একতরফা হস্তক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতিবিদরা। গাদি আইজেনকট আগেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন যেন বাইরের কেউ এই নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা না করে, কারণ নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা কেবল ইসরায়েলি নাগরিকরাই নির্ধারণ করবেন।

বিরোধী জোটের আরেক শীর্ষ নেতা আভিগদর লিবারম্যান আরও কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অভিযোগ করেছেন যে নেতানিয়াহুকে নিজেদের স্বার্থে পুতুলের মতো ব্যবহার করে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রণ করা ট্রাম্পের জন্য বেশ লাভজনক।

তবে ট্রাম্পের এই আকস্মিক সমর্থনে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে কতটা গতি আসবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। এই সমর্থন ঘোষণার ঠিক পরের দিন চ্যানেল টুয়েলভের চালানো জরিপে লিকুদ পার্টির পক্ষে কোনো উল্লেখযোগ্য জোয়ার বা অতিরিক্ত সুবিধা লক্ষ্য করা যায়নি।

জরিপে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য তাঁদের ভোট দেওয়ার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না।

হারেৎজ পত্রিকার সম্পাদক ইশাই হালপারও মনে করেন যে এই ঘোষণার ফলে ডান বা বামপন্থী শিবিরের ভোটারদের দীর্ঘদিনের নির্ধারিত মানসিকতায় বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না।

নির্বাচন পার হয়ে গেলেও আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েল ও ইরান ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে কোনো নতুন হামলা চালানো হবে না, যদিও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে সম্ভাব্য সামরিক বিকল্পগুলো প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

যদিও এই সামরিক প্রস্তুতি হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিশ্চয়তা দেয় না, তবুও ভোটের দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মার্কিন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের অভ্যন্তরে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ইরানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের দামের ওপর। ফলে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন হিসাবের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া লাগাতার সামরিক সাহায্য ও সহযোগিতার যৌক্তিকতা নিয়ে এখন দেশের ভেতরেই বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

ডেমোক্রেটিক পার্টির একাধিক প্রগতিশীল নেতা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিষয়টি জোরালোভাবে তাঁদের নির্বাচনী প্রচারণায় তুলে ধরেছেন। মিশিগানের সিনেট পদপ্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ তাদেরই একজন, যিনি ইসরায়েলি প্রশাসনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত।

এই প্রার্থী বিদেশে যুদ্ধের পেছনে অর্থ ঢালার চেয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা, জীবনযাত্রার খরচ কমানো এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে কথা বলছেন।

এল-সাইয়েদের এই জনমুখী অবস্থানকে প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানরা আক্রমণের মোক্ষম অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছে। স্বয়ং ট্রাম্প তাঁকে একজন চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে সরাসরি আক্রমণ করেছেন।

এই সমস্ত ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাবে এল-সাইয়েদ পাল্টা মন্তব্য করেছেন যে ভোটারদের মূল ও বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরাতেই প্রতিপক্ষ তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ও বিশ্বাসকে সামনে নিয়ে আসছে।

আমেরিকান ভোটারদের একটি বড় অংশের মনে এখন এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে সুদূর বিদেশের যুদ্ধে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হলেও নিজেদের শহরের হাসপাতাল, স্কুল ও গৃহায়নের মতো জরুরি খাতগুলোতে অর্থের তীব্র সংকট দেখা দেয় কেন?

নিউইয়র্কের কংগ্রেস পদপ্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে আরও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের সমর্থিত এই প্রার্থী গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে স্পষ্ট ভাষায় গণহত্যা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর অবদমনাকে বর্ণবাদী নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি ইসরায়েলের ওপর কঠোরভাবে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তুলেছেন এবং তাঁর প্রচারণায় ‘বোমার বদলে শিশুদের পেছনে অর্থ ব্যয় হোক’—এই স্লোগান ব্যবহার করছেন।

নিউইয়র্কের আরেক কংগ্রেস পদপ্রার্থী ক্লেয়ার ভালদেজও ইসরায়েল সরকারের কাছে সব ধরনের মার্কিন সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র চালান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।

নিউইয়র্ক থেকেই কংগ্রেসের লড়াইয়ে নামা অপর প্রার্থী ব্রাড ল্যান্ডারও গাজার পরিস্থিতিকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে আক্রমণাত্মক মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে তিনি শেভালিয়ের মতো কঠোর নন, কারণ তিনি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র কেনার সুযোগ বহাল রাখতে চান।

অবশ্য ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করা আর সেই সুবাদে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া যে সমার্থক নয়, তা বলাই বাহুল্য। অধিকাংশ মার্কিন ভোটারের কাছে জীবনযাত্রার উচ্চমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসন সমস্যাই মূল বিবেচ্য বিষয় হিসেবে টিকে আছে।

তা সত্ত্বেও কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে গাজা সংকট, সামরিক সহায়তা ও নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে নাগরিকদের মনে জমে থাকা এই ক্ষোভ জোরালো হচ্ছে যে নিজেদের দেশের পরিকাঠামোয় টান পড়েলেও কেন অন্য দেশের যুদ্ধে এত অর্থায়ন করা হবে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শতবর্ষের ধারাবাহিকতায় ধলাই নদীতে ঐতিহ্যবাহী পলো উৎসব

শতবর্ষের ধারাবাহিকতায় ধলাই নদীতে ঐতিহ্যবাহী পলো উৎসব