ঢাকা | বঙ্গাব্দ

হজরত উসমান রা.-এর ব্যবসায়িক নীতি ও দানশীলতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2026 ইং
হজরত উসমান রা.-এর ব্যবসায়িক নীতি ও দানশীলতা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

বাণিজ্যের একটি মৌলিক সোনালি নিয়ম হলো সমগ্র বিনিয়োগকে একটিমাত্র নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন খাতে ভাগ করে দেওয়া, যাতে এক ক্ষেত্রের আর্থিক ক্ষতি অন্য ক্ষেত্রের মুনাফা দিয়ে সহজেই সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। প্রাচীনকালে কুরাইশদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এই দূরদর্শী ধারণার অত্যন্ত স্পষ্ট প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। পবিত্র কুরআনের সুরা কুরাইশের প্রথম দুটি আয়াতে তাদের এই নিয়মিত শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক অভিযাত্রার চমৎকার বিবরণ বর্ণিত হয়েছে।

কুরাইশ বণিকরা বছরের শীতল ঋতুতে ইয়েমেন এবং উষ্ণ ঋতুতে শাম তথা সিরিয়া অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করে ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং এর মাধ্যমে তারা কখনোই নির্দিষ্ট কোনো একটি একক বাজার বা নির্দিষ্ট বাণিজ্য পথের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতেন না। বর্তমান যুগের আধুনিক অর্থনীতিবিদ হ্যারি মার্কোউইটজের বিখ্যাত পোর্টফোলিও ডাইভারসিফিকেশন তত্ত্বের প্রাথমিক ও মূল ভাবনাটি মূলত এই প্রাচীন ব্যবস্থারই আধুনিক রূপ।

ইসলামের ইতিহাসে খলিফা হজরত উসমান রা. ছিলেন কুরাইশ গোত্রের অত্যন্ত সফল, দক্ষ এবং অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। সিরিয়াসহ তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বাজারে তাঁর বিশাল পরিসরে ব্যবসা বিস্তৃত ছিল এবং এই বহুমুখী বাণিজ্যিক বিস্তারই তাঁর অর্জিত সম্পদকে যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতেও সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

ইসলামি অর্থনীতিতে মুদারাবা নামক একটি অংশীদারি চুক্তিভিত্তিক ব্যবসার প্রচলন রয়েছে, যেখানে এক পক্ষের কাজ হলো শুধু পুঁজি বিনিয়োগ করা এবং অপর পক্ষ মেধা, শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে সেই ব্যবসা পরিচালনা করেন। এই নিয়মে ব্যবসার লাভ পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট অনুপাতে বণ্টন করা হয় এবং দুর্ভাগ্যবশত লোকসান দেখা দিলে মূলধনদাতা তাঁর অর্থ হারান আর ব্যবস্থাপক তাঁর ব্যয়িত শ্রমের প্রতিদান হারান না।

এই বিশেষ অংশীদারি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরো কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো নিখাদ আমানতদারি রক্ষা করা এবং উভয় পক্ষের মধ্যকার স্পষ্ট ও আন্তরিক পারস্পরিক সম্মতি। সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থের একটি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন তিনি নিজে দুই অংশীদারের তৃতীয় পক্ষ হিসেবে থাকেন, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে কেউ অপরজনের সঙ্গে খেয়ানত বা প্রতারণা করে।

কোনো বিশেষ পণ্যের বাজার চাহিদা হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে এবং তার বিপরীতে পর্যাপ্ত জোগান বা সরবরাহ অপরিবর্তিত থাকলে সাধারণত সেই পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং এর বিপরীত পরিস্থিতিতে দাম হ্রাসের প্রবণতা দেখা যায়। আধুনিক অর্থনীতিতে বাজারদর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ও জোগানের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে এবং বিভিন্ন বাজারের মূল্যের তারতম্যকে কাজে লাগিয়ে পণ্য কেনাবেচা করার এই পদ্ধতিকে আরবিট্রেজ বলা হয়।

একবার মদিনা নগরীতে অত্যন্ত ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার সেই কঠিন সময়ে হজরত উসমান রা.-এর মালিকানাধীন খাদ্যসামগ্রীতে পরিপূর্ণ একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা সেখানে এসে উপস্থিত হয়। শহরের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেই সংকটময় মুহূর্তে চড়া দামে সমুদয় খাদ্যসামগ্রী কিনে নেওয়ার প্রচণ্ড আগ্রহ দেখান এবং মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ পরিশোধের লোভনীয় প্রস্তাব পেশ করেন।

কিন্তু তিনি মুনাফা অর্جون করার পরিবর্তে সেই সম্পূর্ণ খাদ্যভান্ডার বিক্রি না করে নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত মানুষের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করে দেওয়ার মহৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করলে এই ঐতিহাসিক ঘটনার মূল তাৎপর্য হলো বাজারের চাহিদা ও উচ্চমূল্য বিদ্যমান থাকলেই কেবল সর্বোচ্চ মুনাফা লাভ করাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানো উচিত নয়।

একজন প্রকৃত ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত নৈতিক চরিত্র, সমাজের প্রতি নানাবিধ দায়বদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের চরম জরুরি প্রয়োজনও তাঁর যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক হিসেবে প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলাম ধর্মে বাজারের স্বাভাবিক ও সাবলীল কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার ওপর সবসময় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অন্যায়ভাবে মুনাফা লোটার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।

সূত্র: আজকের পত্রিকা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
পরিবর্তন এলো মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামে

পরিবর্তন এলো মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামে