নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
রাজধানী ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়ার তাগিদে জন্মসনদ সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিলে জীবন এক অন্য মোড় নেয় ইয়াকুব আলীর জন্য। নিজের জন্মসনদ তৈরি করতে গিয়ে বাবা আজগর আলীর মাধ্যমে তিনি যে কাগজ হাতে পান, সেখানে জন্মদাতা আপন মায়ের নামের জায়গায় যুক্ত হয় সৎমায়ের নাম। পরবর্তী সময়ে সেই ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয় তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র, যার ফলে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে দাপ্তরিক নথিপত্র এবং কাগজপত্রে সৎমায়ের সন্তান হিসেবেই নিজের পরিচয় বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাঁকে।
তবে এই নাম বিভ্রাটের কারণে তাঁর জীবনে বড় ধরনের বিপত্তি ও জটিলতা তৈরি হয় মূলত আপন মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের প্রশ্ন সামনে আসার পর। পরিবারের অন্য শরিক ও আপন ভাইয়েরা তাঁদের মৃত মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ ঠিকই উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করলেও, জন্মসনদ ও পরিচয়পত্রে মায়ের নাম ভুল থাকায় ইয়াকুব পড়েছেন চরম আইনি ও প্রশাসনিক ভোগান্তিতে। বর্তমানে কৃষিশ্রমিকের পেশায় নিয়োজিত এই মানুষটি নিজের জন্মদাতা আপন মায়ের সত্যিকারের সন্তান হিসেবে নিজেকে আইনগতভাবে প্রমাণ করার জন্য গত চার বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার ১ নং মুকুন্দপুর ইউনিয়নের পারভবানীপুরের বালুপাড়া গ্রামে অবস্থিত তাঁর মূল বাড়ি এবং তিনি ওই এলাকার আজগর আলী ও তাঁর প্রথমা স্ত্রী মৃত আয়েশা বেগম দম্পতির ঔরসজাত সন্তান। জন্মসনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী ইয়াকুব আলীর জন্মতারিখ হচ্ছে ১৯৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, আর তাঁর শৈশবেই ১৯৯৮ সালে মা আয়েশা বেগম তাঁর তিন শিশুসন্তান যথাক্রমে বড় ছেলে আইয়ুব আলী, মেজ ছেলে ইয়াকুব আলী এবং ছোট ছেলে ইউসুফ আলীকে দুনিয়ায় রেখে মৃত্যুবরণ করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে প্রথমা স্ত্রী আয়েশা বেগমের আকস্মিক মৃত্যুর পর পিতা আজগর আলী মোছা. রেজিনাকে বিবাহ করে নতুন সংসার শুরু করেন। এর অনেক বছর পর ২০০৯ সালে ইয়াকুব যখন জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরির জন্য পাড়ি জমান, তখন তাঁর একটি জন্মসনদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই সময় তাঁর বাবা আজগর আলী ছেলের জন্মসনদ তৈরির সময় আপন স্ত্রী আয়েশার নাম বাদ দিয়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী তথা সৎমা মোছা. রেজিনার নাম বসিয়ে একটি নতুন জন্মসনদ তৈরি করিয়ে দেন। পরবর্তীতে সেই ভুল জন্মসনদের তথ্য হুবহু অনুসরণ করেই ২০১৫ সালে ইয়াকুবের নামে যে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড ইস্যু করা হয়, তাতেও তাঁর মায়ের নাম হিসেবে মোছা. রেজিনাই বহাল থেকে যায়।
যদিও ইয়াকুব আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৬ সালে এসে সৎমায়ের নাম বাদ দিয়ে নিজের জন্মদাতা মা আয়েশা বেগমের নাম যুক্ত করে একটি সংশোধিত জন্মসনদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তবে জন্মসনদ সংশোধন করতে পারলেও মা আয়েশা বেগমের রেখে যাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির অংশ ওয়ারিশ সূত্রে মৌখিকভাবে ভোগদখল করার সামান্য সুযোগ পেলেও, সেই জমির ওপর নিজের নামে সরকারি খাজনা প্রদান করা, নামজারি বা খারিজ করা কিংবা জমি বিক্রি করার মতো জরুরি কাজে হাত দিতে গেলেই তিনি বারবার গুরুতর বিপাকে পড়ছেন।
ইয়াকুব আলীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে, তাঁর মা আয়েশা বেগম মৃত্যুর সময় পৈতৃক সূত্রে মোট সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি রেখে গেছেন। জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে ইয়াকুবের মায়ের জায়গায় সৎমায়ের নাম উল্লেখ থাকলে স্বামী আজগর আলী আইনগতভাবে মৃত স্ত্রী আয়েশার রেখে যাওয়া সম্পত্তির মধ্যে তুলনামূলকভাবে বড় একটি অংশ নিজের অনুকૂলে পাবেন—এমন একটি সুদূরপ্রসারী স্বার্থের ভাবনা থেকেই সৎমা রেজিনা তাঁর স্বামী অর্থাৎ ইয়াকুবের বাবাকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি, ২০১২ সালে ইয়াকুব আলীর ছোট ভাই ইউসুফ আলীর অকালমৃত্যু ঘটলে সেই জমির ভাগ আরও বেশি পরিমাণে পাওয়ার পথটি তাঁদের জন্য আরও বেশি পরিষ্কার হয়ে যায়।
এদিকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও ভাগ পাওয়ার লোভে ইয়াকুবের আপন মায়ের নাম সরিয়ে সেখানে নিজের নাম বসানোর ব্যাপারে সৎমা রেজিনার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে বা কথা বলতে সম্পূর্ণ রাজি হননি। তবে সৎমা এবং বাবার বিরুদ্ধে ইয়াকুব আলী যে গুরুতর অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছেন, তাঁর পিতা আজগর আলী সে সমস্ত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন যে, তিনি যখন জন্মসনদে নাম পরিবর্তনের কাজটি করেছিলেন, তখন তাঁর প্রথম স্ত্রী আয়েশা বেঁচে ছিলেন না এবং তিনি মোটেও জানেন না যে কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদে এই কারসাজি করা হয়েছে। আজগর আলীর দাবি, যার মা জীবিত রয়েছে, সেই সৎমায়ের নাম তুলে দিয়ে জন্মসনদ তৈরি করার কাজটি তিনি নিজে করলে অবশ্যই ইয়াকুবের আসল মায়ের নামই সেখানে যুক্ত করতেন।
ঢাকாவில் চাকুরিজীবনের পাট চুকিয়ে ইয়াকুব সেখানে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ২০২১ সালে কর্মজীবন ছেড়ে পাকাপাকিভাবে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর ২০২৩ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ডে নিজের আপন মা আয়েশা বেগমের সঠিক নাম সংযোজন করার জন্য তিনি বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন করেন, কিন্তু সেই বছরই তাঁর সে আবেদনটি নামঞ্জুর বা বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে হাল ছাড় না দিয়ে তিনি ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও সংশোধনের জন্য আবেদন করেন এবং প্রতিবারই তাঁর আবেদন বাতিল হয়ে যায়। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর আপন মা আয়েশা বেগমের প্রকৃত সন্তান হিসেবে নিজেকে আইনগতভাবে প্রমাণ করার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের নির্দিষ্ট সকল চাহিদা ও নিয়ম অনুযায়ী সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ পুনরায় অনলাইনে আবেদন জমা দিয়েছেন ইয়াকুব।
এই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল হাকিম মণ্ডল গণমাধ্যমকে জানান যে, ইয়াকুব আলী তাঁর মায়ের নাম সংশোধনের জন্য যে আবেদনটি দাখিল করেছেন, সেটি প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী ‘ঘ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়। এই ধরনের জটিল সমস্যার সমাধান করার এখতিয়ার বা ক্ষমতা উপজেলা কার্যালয়ের নেই, কারণ এটি সরাসরি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক মহোদয় দেখে থাকেন। তবে নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক যদি সদয় হয়ে এ বিষয়ে একটি তদন্তের নির্দেশ প্রদান করেন, কেবল তখনই তিনি সেই নির্দেশ অনুযায়ী সরেজমিন তদন্ত সম্পন্ন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রেরণ করতে পারবেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo