নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদ্রাসায় সাত বছরের এক মেয়েশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় মামলা করা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। গত সোমবার দুপুরের দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তিনি পরিবারসহ চরম ভয়ের মধ্যে দিন কাটানোর কথা জানান। এর পরপরই গতকাল সোমবার রাত এগারোটার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে তিনি নাকি ইতোমধ্যে গোপনে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি নিয়ে পরে শিশুটির আইনি প্রতিনিধি মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
আইনজীবী মোমিন উদ্দিন আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনের মাধ্যমে জানান, তাঁর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে এই মূহূর্তে তিনি আসলেই অন্য কোনো রাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে তিনি বিদেশে গেলে অভিবাসন বিভাগ বা ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানাজানি হতো। প্রতিপক্ষ মহল সুযোগ বুঝে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা মব জাস্টিস সৃষ্টি করতে পারে—এমন গভীর আশঙ্কার বশবর্তী হয়েই হয়তো তিনি বর্তমানে জনসমক্ষে আসা থেকে বিরত থাকছেন।
ঘটনার পর থেকে আজ মঙ্গলবার দিনভর ভুক্তভোগী শিশুর বাবার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করে যোগাযোগের চেষ্টা চালায় সংবাদমাধ্যম। তবে প্রতিবারই তাঁর ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায় এবং কোনোভাবেই সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ওই শিশুটির বাবা সত্যিই দেশত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এই ব্যাপারে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি আরিফুর রহমান আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানান, তাঁর বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত বা নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন পর্যন্ত তাদের হাতে পৌঁছায়নি। মূলত ভার্চুয়াল জগত বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই এ বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাਤੇ জানা গেছে, লাগাতার হুমকি পাওয়ার কারণে এবং চরম আতঙ্কগ্রস্ত থাকায় শিশুটির পরিবার টঙ্গীর নিজেদের নির্দিষ্ট বাসায় আপাতত অবস্থান করছেন না। গত সোমবার দুপুরে যখন তাদের ফ্ল্যাটে সরাসরি খোঁজ নিতে যাওয়া হয়, তখন সেখানে পরিবারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য ওই সময় শিশুটির বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলা সম্ভব হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৯ অক্টোবর, যখন টঙ্গীর একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় সাত বছরের এক কন্যাশিশুকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এই লোমহর্ষক ঘটনার খবর জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা ও স্বয়ং শিশুটির বাবা অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে হাতেনাতে আটক করেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের নিকট সোপর্দ করেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও পরবর্তীতে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
শিশুর বাবার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেমকে গত ২১ অক্টোবর গ্রেফতার করে এবং আদালতে সোপর্দ করলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর গত ২৫ অক্টোবর তাঁর জামিন শুনানির নির্ধারিত দিনে আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে তাঁর জামিন আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেন।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসায় শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার প্রাথমিক সত্যতা এরই মধ্যে মিলেছে। এ প্রসঙ্গে গত ২৪ অক্টোবর টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, পুলিশ ঘটনাস্থল সরাসরি পরিদর্শন করে বিভিন্ন ধরনের আলামত জব্দ করেছে। সেই সব আলামতের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে শিশুটিকে নির্যাতনের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে এবং এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নির্যাতনের এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে বা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহম্মদ গত ২০ অক্টোবর ঘটনার ঠিক পরের দিনই শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাদের বাসায় হাজির হয়েছিলেন। সে সময় তাঁর হাতে একটি মিষ্টির প্যাকেটও ছিল। তবে ভুক্তভোগী পরিবার তাঁর আহ্বানে কোনো ধরনের সাড়া না দেওয়ায় তিনি ফ্ল্যাটের দরজা থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হন। ওই বহুতল ভবনের ক্লোজড সার্কিট বা সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়ে।
ফ্ল্যাটের ভেতর প্রবেশ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক সেদিন দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে শিশুটির মায়ের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি খুদে বার্তা পাঠান। ওই বার্তায় তিনি লিখেছিলেন যে তিনি ঠিক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাদের সঙ্গে জরুরিভাবে একটু দেখা করতে এসেছেন।
তবে ভেতর থেকে পরিবারের কোনো সদস্য দরজা না খোলায় এবং কোনো সাড়া না দেওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে চলে যান। উল্লেখ্য যে, শিক্ষক যখন বাসায় এসেছিলেন, তখন শিশুটির বাবা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত মাদ্রাসা থেকে ১৭ লাখ টাকা লুটের যে পালটা অভিযোগ শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সেই সংক্রান্ত মামলার তদন্তও বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান জানান, মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরার সংরক্ষিত ফুটেজ পরীক্ষা করে টাকা নেওয়া বা সরানোর কোনো দৃশ্য সেখানে দেখা যায়নি। তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে এর বাইরে অন্য কোনো দালিলিক প্রমাণ বা তথ্য রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং পুলিশও নিজেদের মতো করে বিষয়টি তদন্ত করছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করার প্রাথমিক অভিযোগ এবং পরবর্তীতে ১৭ লাখ টাকা লুটের পালটা মামলার তদন্ত দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় আলাদাভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo