নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি হেরে গেলে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরির আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমের সূত্রে প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ফল প্রত্যাখ্যান করে জালিয়াতির দাবি তুলেছিলেন, লিকুদ পার্টি ঠিক সেই একই রকম পন্থায় প্রচারণার পরিকল্পনা নিয়ে নিজেদের ভেতর বিস্তারিত আলোচনা সম্পন্ন করেছে।
ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েলভের এক সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, মূলত দেশের আরব জনগোষ্ঠী প্রধান এলাকাগুলোর ভোটকেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করে ইতোমধ্যে বেশ কিছু জালিয়াতির অভিযোগের খসড়া প্রস্তুত করে রেখেছে নেতানিয়াহুর এই রাজনৈতিক দল। দলটির নিয়োজিত কর্মীরা মূলত ভোটকেন্দ্রে মুখ ঢাকা বোরকা পরিহিতা নারী ভোটারদের উপস্থিতি এবং নারী-পুরুষের পৃথক সময়ে ভোটদান সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে এই সমস্ত অভিযোগ উত্থাপনের সুনির্দিষ্ট ছক কষছেন।
এই সমস্ত স্পর্শকাতর ভোটকেন্দ্রে কড়া নজরদারি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে লিকুদ পার্টি ইতিমধ্যে আরব অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে তাদের দল থেকে কয়েক হাজার কর্মী মাঠে নামিয়েছে। চ্যানেল টুয়েলভ জানিয়েছে, দেশের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বর্তমান আইন ও বিধিমালায় এই সমস্ত বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার নির্দেশনা ও নিয়মকানুন উল্লেখ রয়েছে, তা সত্ত্বেও লিকুদ পার্টি সুনির্দিষ্টভাবে কারচুপির অভিযোগ তোলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে।
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনে যদি শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করতে হয়, তবে সেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি মাথায় রেখেই দলটির উচ্চপর্যায়ের নেতারা আগেভাগে বিকল্প পরিকল্পনা সাজিয়ে রাখছেন। সেখানে একটি বড় পরিসরে দেশজুড়ে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলার বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতর বেশ পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দৈনিক হারেৎজকে জানিয়েছে যে, নির্বাচনে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পেলে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, তা নিয়ে একাধিকবার অভ্যন্তরীণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসরণে ‘নির্বাচনে ভোট চুরি ও বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে’ মর্মে জোরালো প্রচারণায় নামার পক্ষে সুস্পষ্ট মত প্রকাশ করা হয়েছে।
যদিও এই সমস্ত কৌশলগত আলোচনাগুলোতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না বলে জানা গেছে, তবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে তিনি ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সম্ভাবনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করে চলেছেন।
সংবাদমাধ্যম হারেৎজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরব এলাকার সম্ভাব্য ভোট জালিয়াতি সংক্রান্ত বিষয়ে লিকুদ পার্টির ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি ব্যাখ্যার খাতিরে ধরা যাক কোনো নারী মুখ ঢাকা বোরকা পরিধান করে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করলেন, তার ঠিক মাত্র কয়েক মিনিট পর অন্য আরেকজন নারী একই রকম বোরকা পরে ভোট দিতে এলেন, সেক্ষেত্রে প্রথম জন এবং দ্বিতীয় জন একই ব্যক্তি কি না, তা আমাদের নিজস্ব দায়িত্বে যাচাই করে দেখতে হবে।
এদিকে দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, ভোটকেন্দ্রের সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে ভোটারদের ব্যক্তিগত পরিচয় বা তথ্য জানতে চাওয়ার কোনো ধরনের আইনগত এখতিয়ার বা অধিকার দলীয় কর্মীদের দেওয়া হয়নি। তবে কোনো নারী ভোটার যদি দলীয় কর্মীদের কাছে নিজের পরিচয় জানাতে সাফ অস্বীকৃতি জানান, সে ক্ষেত্রে কর্মীরা ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, সে বিষয়ে লিকুদ পার্টির ওই সূত্রটি সুনির্দিষ্ট করে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
তবে লিকুদ পার্টির ওই সূত্রটি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছে যে, আরব জনবহুল এলাকাগুলোতে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য জালিয়াতি বা অনিয়ম দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যেই মূলত তাঁরা দলগতভাবে সবচেয়ে বড় এবং সর্বব্যাপী কর্মতৎপরতা ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
লিকুদ পার্টি এবং তাদের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক মিত্র দল রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি যৌথভাবে আরব ভোটারদের কেন্দ্রগুলোতে সব মিলিয়ে দুই হাজার দলীয় কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ায় দেশটির বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই সমস্ত দলীয় কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকার কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক দায়িত্ব কিংবা নজরদারি চালানোর ন্যূনতম আইনি এখতিয়ারও নেই।
মূলত আরব অধ্যুষিত অঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বা যুক্তিতে এই ধরনের ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা ধরে নিয়েছে, সেই বিষয়ে লিকুদ পার্টি কিংবা তাদের শরিক রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি কেউই এখন পর্যন্ত গণমাধ্যম বা জনগণের সামনে কোনো সদুত্তর বা ব্যাখ্যা দেয়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক দিন লিবনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো ভোট জালিয়াতি ঘটার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই এবং বিদ্যমান সামগ্রিক সুরক্ষাব্যবস্থা ভোট সুষ্ঠু রাখার জন্য পুরোপুরি যথেষ্ট। পাশাপাশি, ‘মুভমেন্ট ফর কোয়ালিটি গভর্নমেন্ট ইন ইসরায়েল’ নামক প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে যে, ভোট চলাকালীন যেকোনো ধরনের নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা যেন দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করা যায়, সেই উদ্দেশ্যে তারা একটি বিশেষ হটলাইন সেবা চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo