ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বেতনহীন বেসরকারি চাকরিতে কীভাবে চালাবেন দর-কষাকষি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 28, 2026 ইং
বেতনহীন বেসরকারি চাকরিতে কীভাবে চালাবেন দর-কষাকষি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

সরকারি চাকরির বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনে পদের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট আর্থিক স্কেল ও গ্রেড জুড়ে দেওয়া থাকে, ফলে প্রার্থীরা শুরুতেই মাসিক উপার্জনের বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। বিপরীতে দেশের বেসরকারি খাতের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা, যেখানে বিপণন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো নানা ক্ষেত্রে দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বিবরণ থাকলেও বেতনের জায়গায় শুধু ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ কথাটি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

উপার্জনের নির্দিষ্ট পরিমাণ কত হতে পারে তা না জেনেই বহু তরুণ আবেদন করতে বাধ্য হন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ফেরত নবীনদের জন্য বেশ জটিল পরিস্থিতির জন্ম দেয়। পূর্বের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় নির্দিষ্ট পদের বিপরীতে কোন অঙ্কের টাকা দাবি করা যৌক্তিক, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো পরিষ্কার ধারণা থাকে না এবং প্রাথমিক আলাপচারিতায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না সেই ভীতিও কাজ করে।

বিজ্ঞাপনে আর্থিক অংক গোপন থাকায় প্রার্থীর পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও নিজের দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে প্রথমবার কাজের সন্ধানকারীদের ক্ষেত্রে এই সংকট বেশি দেখা যায়। কোন পদের জন্য কেমন পারিশ্রমিক মিলে কিংবা কী ধরনের দক্ষতার কারণে বেশি অর্থ দাবি করা যায়, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাবে তাঁরা নানাবিধ জটিলতায় পড়েন।

স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরিপ্রার্থী হিসেবে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন মাহফুজ রহমান, যিনি পছন্দসই পদ পেলেও বেতনের নির্দিষ্ট পরিমাণ লেখা না থাকায় আবেদন করার আগে বেশ ধন্দ্বে পড়েন। পারিশ্রমিক কেমন হতে পারে তা না জানায় নিজের কাঙ্ক্ষিত অংক নির্ধারণ করা তাঁর জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

একই রকম অনিশ্চয়তার শিকার অপর চাকরিপ্রার্থী সিদ্ধার্থ রায়, যিনি নতুন পেশায় প্রবেশের সময় কত টাকা দাবি করা উচিত তা নিয়ে সংশয়ে ভোগেন। তাঁর মনে সবসময় এই দুশ্চিন্তা কাজ করে যে বেশি পারিশ্রমিক চাইলে প্রতিষ্ঠান তাঁকে বাদ দিতে পারে, আবার কম চাইলে নিজের যোগ্যতার উপযুক্ত মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হবেন।

বেতন না থাকার এই সমস্যা শুধু নতুনদের জন্যই নয়, বরং পূর্বে থেকেই কর্মরত ব্যক্তিরাও অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পূর্বে বর্তমান পারিশ্রমিক, যাতায়াত খরচ, কাজের সময় এবং অন্যান্য সুবিধার সঙ্গে তুলনা করতে চান। কিন্তু বিজ্ঞাপনে আর্থিক ধারণার অনুপস্থিতি থাকায় তাঁদের পক্ষে আগে থেকেই এই ধরনের হিসাব কষে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না।

চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে পারিশ্রমিকের তথ্য গোপন রাখার এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাকে সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অপেশাদার বলেই মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোশারফ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান যে আমাদের দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রটি এখনো পূর্ণাঙ্গ পেশাদার ও আধুনিক রূপ লাভ করতে পারেনি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে প্রায় প্রতিটি বেসরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক কিংবা আলোচনা সাপেক্ষে কথাটি লেখা একধরনের প্রথায় পরিণত হয়েছে, যা মোটেও কাম্য নয়।

মোশারফ হোসেনের মতে, অনেক প্রার্থীই নতুন প্রতিষ্ঠানে অধিক উপার্জনের আশায় ফরম পূরণ করেন, কিন্তু বাছাই প্রক্রিয়ার একেবারে শেষ ধাপে গিয়ে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলক কম বেতনের প্রস্তাব দিচ্ছে। ফলে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষেরই মূল্যবান সময় ও শ্রম অপচয় ঘটে থাকে।

বিজ্ঞাপনে অর্থের অংক উল্লেখ না থাকায় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও চাকরিপ্রার্থীর মাঝে একধরনের তথ্যের বড় রকমের অসমতা তৈরি হয়। পদের বিপরীতে নির্ধারিত বাজেট সম্পর্কে নিয়োগদাতা সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকলেও প্রার্থী পুরোপুরি অন্ধকারে থাকেন, যার কারণে চূড়ান্ত দর-কষাকষির টেবিলে প্রতিষ্ঠানটি সবসময় কৌশলগতভাবে শক্ত অবস্থানে থাকে।

বেতনের অঙ্ক উল্লেখ না করার এই সংস্কৃতির খুব দ্রুত পরিবর্তন হবে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই, তাই চাকরিপ্রার্থীদের নিজেদেরই পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা আবশ্যক।

প্রথমত, সমজাতীয় পদে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কেমন পারিশ্রমিক দিয়ে থাকে, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিচিতজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষার্থী কিংবা নির্দিষ্ট সেক্টরে কর্মরত ব্যক্তিদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নিজের কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিক পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। খাবার, যাতায়াত ও বাসাভাড়ার মতো মাসিক খরচের হিসাবের পাশাপাশি পদের কাজের পরিধি, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বর্তমান বাজারদর গভীরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, সাক্ষাত্কারের উপযুক্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে নির্দিষ্ট বেতনসীমা জানতে চাওয়া যেতে পারে, যেমন এই পদের জন্য নির্ধারিত আর্থিক সীমা কত। এতে নিজের প্রত্যাশা প্রকাশের পূর্বে নিয়োগকর্তার অবস্থান পরিষ্কার হওয়া সহজ হয়।

চতুর্থত, কেবল মূল পারিশ্রমিক নয়, বরং স্বাস্থ্যবিমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, যাতায়াত ও উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বিবেচনা করতে হবে। সমান মূল বেতনের দুটি আলাদা চাকরিতে এসব সুবিধার তারতম্যের কারণে প্রকৃত আর্থিক পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

পঞ্চমত, কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিক প্রকাশের সময় নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, কাজের দায়িত্ব ও বাজারের বাস্তবতার সাপেক্ষে যথাযথ যুক্তি তুলে ধরতে হবে। একটিমাত্র নির্দিষ্ট অঙ্কে আটকে না থেকে বরং যুক্তিসংগত একটি বেতনসীমা প্রকাশ করা শ্রেয় এবং প্রস্তাব কম হলে পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে কি না তাও জেনে নেওয়া যায়।

মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজ্ঞাপনে বেতনের অঙ্ক স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে প্রার্থীরা শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা উভয় পক্ষেরই সময় ও শ্রম বাঁচায়। এছাড়া আলোচনা সাপেক্ষে কথাটি থাকলেও সেই আলোচনা কখন, কী ভিত্তিতে এবং কোন সীমার মধ্যে হবে সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকলে অনিশ্চয়তা অনেকটাই হ্রাস পায়।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
কলেরার টিকা ও বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরীকে নিয়ে বিল গেটসের ভিডিও

কলেরার টিকা ও বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরীকে নিয়ে বিল গেটসের ভিডিও