নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
আমাদের সমাজে এমন কিছু ধার্মিক মানুষকে পাওয়া যায়, যাঁদের এমন একটি বিশ্বাস রয়েছে যে অসুস্থতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং তিনিই একমাত্র নিরাময়কর্তা; ফলে ওষুধ সেবন করা আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার পরিপন্থী কাজ। এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে বহু মানুষ মারাত্মক অসুস্থতার শিকার হয়েও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে কুণ্ঠাবোধ করেন এবং ঘরেই অবস্থান করেন।
এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগে যে, রোগাক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা না নেওয়া বা ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধ বা পাপের শামूक? এই জটিল প্রশ্নের সঠিক উত্তর মূলত নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট রোগের তীব্রতা, প্রকোপ এবং রোগীর মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর, যা ইসলামি বিধান অনুযায়ী বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, অসুস্থতার সময় ওষুধ বা প্রতিষেধক গ্রহণ করা ইসলামি জীবনব্যবস্থায় তাওয়াক্কুলের বা আল্লাহর ওপর ভরসার কোনো বিরোধী বিষয় নয়; বরং এটি স্বয়ং প্রিয় নবীজির একটি অন্যতম সুন্নাহ ও সুনির্দিষ্ট হাদিস। তিনি নিজে কখনো অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসা করাতেন, তেমনই তাঁর প্রিয় সাহাবিদেরও সবসময় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতেন।
একবার প্রখ্যাত একদল বেদুঈন সাহাবি মহানবী (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি কোনো ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করব? উত্তরে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাঁদের বলেছিলেন, হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করো, কারণ আল্লাহ তাআলা বার্ধক্য ছাড়া এমন কোনো মরণব্যাধি সৃষ্টি করেননি যার কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ তিনি অবতীর্ণ করেননি।
অপরদিকে অনেকের মাঝেই এই ভুল ধারণাটি গভীরভাবে শেকড় গেড়ে বসেছে যে, ওষুধ সেবন না করে চুপচাপ ঘরে বসে থাকাই বুঝি একমাত্র প্রকৃত তাওয়াক্কুল বা ভরসা। অথচ তাওয়াক্কুলের সঠিক এবং মূল অর্থ হলো—চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখার পাশাপাশি জাগতিক উপায়-উপকরণ বা আসবাবগুলো যথাযথ নিয়মে গ্রহণ করা।
ইসলামের বিশিষ্ট পণ্ডিত ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়া তাঁর একটি গ্রন্থে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন যে, ক্ষুধা নিবারণের তাগিদে খাবার গ্রহণ করা এবং পিপাসা মেটানোর জন্য পানি পান করা যেমন আল্লাহর ওপর আস্থার পরিপন্থী নয়, ঠিক তেমনি রোগমুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে ওষুধ সেবন করাও তাওয়াক্কুলের বিরোধী হতে পারে না; বরং কোনো উপায় বা মাধ্যম অবলম্বন না করে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা ইসলামি দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ইসলামি আইনবিশারদ বা ফকিহগণের সর্বসম্মত মতে, চিকিৎসা গ্রহণের হুকুম বা বিধানটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে রোগীর বর্তমান শারীরিক অবস্থার ওপর। কোনো ব্যক্তির রোগ যদি সাধারণ জ্বর, সর্দি কিংবা মাথাব্যথার মতো মামুলি প্রকৃতির হয়, যা প্রাকৃতিকভাবেই এমনিতেই ভালো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তিনি যদি ওষুধ না খেয়ে সবুর বা ধৈর্য ধারণ করেন, তবে এতে কোনো পাপ হবে না।
তবে যদি কোনো ব্যক্তির রোগ মারাত্মক প্রাণঘাতী হয় এবং বিজ্ঞ চিকিৎসকেরা এই বিষয়ে নিশ্চিত করেন যে নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন না করলে রোগীর অকালমৃত্যু ঘটতে পারে কিংবা শরীরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ চিরকালের মতো নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তখন চিকিৎসা গ্রহণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘ওয়াজিব’ বা অবশ্য পালনীয় অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।
এই বিশেষ পরিস্থিতিতে কেউ যদি জেদের বশে ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকে এবং এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তার মৃত্যু ঘটে, তবে সে অবশ্যই আত্মহত্যার চরম পাপে পাপী বলে গণ্য হবে। কারণ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা নিজেদের নিজ হাতে কোনোভাবেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের অন্য একটি আয়াতে আরও ইরশাদ করেছেন যে, আর তোমরা নিজেদের কখনো হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান ও পরম দয়ালু। ইসলামের সার্বিক অন্যতম একটি মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মানবজীবন রক্ষা করা, যাকে ফিকহের ভাষায় ‘হিফজুন নাফস’ বলা হয়ে থাকে।
ইসলামি আইনশাস্ত্র বা মাকাসিদুশ শরিয়াহর পাঁচটি মৌলিক বা প্রধান উদ্দেশ্যের একটি হলো এই জীবন রক্ষা করা, যা শরিয়তে অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। বিখ্যাত আলেম ইমাম নববি তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন যে, রোগের কারণে যদি জীবননাশের প্রবল আশঙ্কা থাকে এবং চিকিৎসা নিলে রোগীর সুস্থ হওয়ার উজ্জ্বল ও জোরালো সম্ভাবনা থাকে, তবে অধিকাংশ প্রবীণ আলেমের মতে তখন ওষুধ গ্রহণ করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়; আর এমন সংকটময় অবস্থায় চিকিৎসা বর্জন করা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে ইসলাম যেমন অত্যন্ত জোরদার তাগিদ দিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে সেবনের জন্য নির্ধারিত ওষুধটি হালাল কি না, সে বিষয়েও দারুণ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব হলো চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রতিটি বস্তু সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র হওয়া নিশ্চিত করা, যাতে কোনো হারামের সংমিশ্রণ না থাকে।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোগ এবং তার ওষুধ বা প্রতিষেধক দুটোই পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেছেন, সুতরাং তোমরা অবশ্যই চিকিৎসা গ্রহণ করবে, তবে কোনো অবস্থাতেই হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা সম্পন্ন করবে না।
অবশ্য জীবন-মৃত্যুর চরম সন্ধিক্ষণে যদি কোনো হালাল বিকল্প চিকিৎসাসামগ্রী বা ওষুধ একেবারেই খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে ইসলামি আইন ও শরিয়তের বিধান অনুযায়ী অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শক্রমে সামান্য পরিমাণে হারাম বস্তু ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo