নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ঊনত্রিশটি দেশের নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে রাশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংগৃহীত তথ্যে এই মানবপাচারের ভয়ংকর চিত্র প্রকাশিত হয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, রাশিয়ায় পা জমানোর পর অনেক ভিনদেশি নাগরিককে সে দেশের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করা হতো। সম্পূর্ণ রুশ ভাষায় রচিত এই চুক্তির শর্তগুলো তাঁরা বুঝতে পারতেন না।
এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের মুঠোফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতো এবং তাদের অবাধ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতো। ফলে তাঁরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে যেতেন।
কিছু সময় পর এসব প্রবাসীর বোধগময় হতো যে, তাঁদের কোনো বেসামরিক কাজের জন্য আনা হয়নি; বরং তাঁদের রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে হবে।
প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর স্ত্রীর জবানবন্দি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, তাঁর স্বামীর কাছ থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক চুক্তিপত্রে সই করানো হয়েছিল।
ওই নারীর বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর স্বামী তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন এবং তাঁর সামনে কোনো বিকল্প রাস্তা খোলা ছিল না।
কমিশনের তদন্তে প্রকাশ পায় যে, রুশ বাহিনীতে নাম লেখানোর পর এসব বিদেশি নাগরিকদের ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে সামনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হতো। তাঁদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ দেওয়া হতো।
এই বিপজ্জনক দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন, প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী হয়েছেন কিংবা চিরতরে নিখোঁজ হয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জীবনে নেমে এসেছে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও চরম আর্থিক সংকট।
ভালো বেতনের পেশার আশায় বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেকে দালাল বা নিয়োগকারী সংস্থাকে প্রচুর অর্থ প্রদান করেছিলেন। এর জন্য পরিবারগুলো ঋণ করেছে বা সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করেছে।
পরবর্তীতে আপনজনের মৃত্যুর সংবাদ পেলেও কোনো কোনো পরিবার তাঁদের মরদেহ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
নিখোঁজ প্রিয়জনের সন্ধান পেতে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও অনেক পরিবার কোনো নিশ্চিত বা নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়নি।
তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বহু ক্ষেত্রে নিয়োগকারী এজেন্টরা ভুক্তভোগী পরিবারের ফোনকল পর্যন্ত রিসিভ করতেন না।
যদিও প্রতিবেদনে ২৯ দেশের নাগরিকদের সামগ্রিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তবে প্রতিটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের নাম আলাদা করে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্ত কমিশন বিভিন্ন দেশে সক্রিয় দালাল চক্রের সঙ্গে রুশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের জোরালো প্রমাণ হাতে পেয়েছে।
কমিশনের অনুসন্ধান বলছে, আকর্ষণীয় চাকরির ভুয়া প্রতিশ্রুতি দেওয়া, প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতাকে পুঁজি করা এবং বলপ্রয়োগ করে সামরিক চুক্তিতে সই করানো—এসবই মানবপাচার ও সামরিক বাহিনীতে বলপূর্বক নিয়োগের সমার্থক।
সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন সংশ্লিষ্ট ঘটনায় রাশিয়ার কতৃপক্ষের মানবপাচারসহ অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করেছে।
কমিশন রাশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন অবিলম্বে এই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও বিচারকার্য সম্পন্ন করে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন ভুক্তভোগীদের মুক্ত করতে রুশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, পাচারকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন এবং এই ধরনের জালিয়াতিমূলক নিয়োগ রোধে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালান।
এর আগেও রাশিয়ায় চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছিল।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনেও এ ধরনের জালিয়াতির বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই দলিলে বলা হয়, আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির উদ্দেশ্যে বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাঁদের জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
তখন ব্র্যাকের পক্ষ থেকেও এই ধরনের প্রতারণা অবিলম্বে বন্ধ করা, ভুক্তভোগী নাগরিকদের উদ্ধার এবং সরকারি ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশিদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা ও দুর্ভোগের কথা প্রকাশিত হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরের এই যুদ্ধে কমপক্ষে চৌান্ন জন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের অবর্ণনীয় দুর্দশা, ঋণের পাহাড় এবং স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারার মর্মান্তিক বিষয়গুলোও বারবার সামনে চলে এসেছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
Daily Diner Alo