নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে জনসমক্ষে পূর্বে যে অবস্থান জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন, এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও সুনির্দিষ্টভাবে সেই একই কথা তুলে ধরেছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি হলফনামা দাখিল করেছে কমিশন। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এসআইআর সংক্রান্ত বিষয়ে যে তিনটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, তার প্রতিটিই সম্পূর্ণ সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতে পাস করা হয়েছে। বিশেষ করে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একপক্ষীয়ভাবে বা একক দায়িত্বে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি বলে হলফনামায় জোর দিয়ে দাবি করা হয়েছে।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে কোনো ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে যে আলোচনা উঠেছিল, তাকে সম্পূর্ণ অসত্য বলে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিন্নমত বা আলোচনার অবকাশ থাকতেই পারে এবং এটি একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে মতপার্থক্য বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকার অর্থ এই নয় যে সেখানে কমিশনের ভেতরে কোনো বড় ধরনের অনৈক্য বা মতবিরোধ রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা এবং মতবিনিময়ের পর চূড়ান্ত পর্যায়ে সমস্ত সিদ্ধান্তই পারস্পরিক ঐকমত্যের মাধ্যমেই গ্রহণ করা হয়ে থাকে বলে হলফনামায় জানানো হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, আদালতের এই গুরুত্বপূর্ণ হলফনামাটি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কমিশনের তিনজন সদস্যের পূর্ণ সম্মতি এবং অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনের জেরে জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপদ্ধতি এবং এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালে তাঁর এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় একাধিক মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। ওই সমস্ত মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই তিন সদস্যের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ পাঠিয়েছিল আদালত। গত সোমবার সেই নোটিশের আনুষ্ঠানিক জবাব হিসেবেই এই হলফনামা আদালতে দাখিল করা হয়।
আদালতে পেশ করা তথ্যে কমিশন জানিয়েছে যে, বিগত ২০২৫ সালের ২৪ জুন, একই বছরের ২৭ অক্টোবর এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৪ মে এসআইআর বা ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় যে তিনটি পৃথক নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল। কমিশনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, মূলত একটি নির্দিষ্ট সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই এই অভিযোগগুলোর অবতারণা করা হয়েছে এবং জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
যেকোনো নথিপত্র বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে কমিশন। বিভিন্ন পরামর্শ, সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ এবং নানান প্রশ্ন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করার পরই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিভিন্ন ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মতবিরোধ রয়েছে। প্রথমে ফাইলগুলো নির্বাচন কমিশনারদের কাছে পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে তা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরে পৌঁছায়। জরুরি পরিস্থিতির ক্ষেত্রে অনেক সময় অনলাইনেও অনুমোদন গ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তীতে তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। এভাবেই সুনির্দিষ্ট নিয়মে গৃহীত সিদ্ধান্ত কস্মিনকালেও কারও একক সিদ্ধান্ত হতে পারে না, বরং তা সর্বদা সর্বসম্মতভাবেই কমিশনের সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।
হলফনামার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো একটি নির্দিষ্ট ফাইলের মধ্যে কোনো সদস্যের ব্যক্তিগতভাবে লিখে রাখা নোট বা তাঁর মনে উদিত কোনো প্রশ্নকে কখনোই নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা চলে না। তা ছাড়া, কমিশনের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোনো নথি বা ফাইলের অংশবিশেষ সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করার জন্য কাউকেই কোনো ধরনের পূর্বানুমতি দেওয়া হয়নি বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
এই পুরো এসআইআর বিতর্কটি কেন্দ্র করে ফর্ম ৬–এ পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছিল এবং এ নিয়ে চারদিকে প্রবল বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছিল। এর জবাবে কমিশন এর আগে বলেছিল যে, বিহারে এসআইআর চলাকালীন ফর্মের ওই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টই তাদের দিয়েছিল। যদিও সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তীতে জানায় যে তারা এ ধরনের কোনো অনুমতি দেয়নি এবং সেই সময় বিহারের এসআইআরের পরিমণ্ডলে এমন কোনো প্রশ্নই উত্থাপিত হয়নি। এই সুনির্দিষ্ট বিতর্কের জবাব দিয়ে কমিশন হলফনামায় নতুন করে জানিয়েছে যে, ফর্ম ৬–এর মূল বিন্যাসে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কারণ, এই ধরনের কোনো ফর্ম পরিবর্তন করার আইনি এখতিয়ার কেবল একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারেরই হাতে রয়েছে।
সাধারণত ফর্ম ৬–এর মাধ্যমেই নতুন ভোটারদের নাম সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা হয়ে থাকে। মূলত সেই ফর্মের ভেতর নতুন কিছু তথ্য সংযোজন করা নিয়ে সমগ্র বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল। কমিশন তাদের দাখিল করা হলফনামায় জানিয়েছে যে, নতুন কোনো নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনলাইন আবেদনের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়। মূলত এই ঘোষণাপত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি নথি। সেখানে সংশ্লিষ্ট নতুন ভোটারের পিতা–মাতা, দাদা–দাদি কিংবা নানা–নানির নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, সেই নির্দিষ্ট তথ্যটি জানানোর কথা বলা হয়েছে।
অনলাইন আবেদনপত্রের সঙ্গে অতিরিক্ত এই সংযোজনটি যেভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে, তা দেখে অনেকের মনেই এই ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে বুঝি ফর্ম ৬–এর মূল বিন্যাসেই পরিবর্তন ঘটিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সেই ভুল বোঝাবুঝির কথা স্বীকার করে নিয়েছে।
যেসকল ভোটারের নাম পুরোনো ভোটার তালিকাগুলোর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি অর্থাৎ যাঁদের ম্যাপিংয়ের কাজটি সম্পন্ন হয়নি, তাঁদের শুনানির প্রক্রিয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে সশরীরে কমিশনের কার্যালয়ে হাজির হতে হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে। বুথ স্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই নিজ দায়িত্বে তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্রগুলো সংগ্রহ করবেন। এরপরও যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি শুনানির প্রয়োজন অনুমিত হয়, তবে তা সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
কমিশনের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, ‘ইসিআইনেট’ নামক অনলাইন ব্যবস্থার মারফত সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত বা কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে। এই অভিযোগের জবাবে হলফনামায় পরিষ্কার করা হয়েছে যে, উক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ভোটারের নাম নতুন করে তালিকাভুক্ত করা বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন নিবন্ধন কর্মকর্তার অর্থাৎ ইআরও-র নির্দেশই একমাত্র বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য হয়। গোয়ার ভোটার তালিকাকে কেন্দ্র করে অতীতে যে অনভিপ্রেত বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে কমিশন জানিয়েছে যে, সেখানে মোট ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৮৮ জনের নাম যথাযথভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তাঁর নির্ধারিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত রাখার যে আবেদন জানানো হয়েছিল, তা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে হলফনামায় বলা হয়েছে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হলে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের সম্মানিত বিচারপতিদের মতো তাঁকেও যথাযথ নিয়মে অভিশংসিত করতে হবে। সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে এমন কিছু করা আইনগতভাবে সম্ভব নয়।
উপস্থিত সময়ে ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের বিভিন্ন কাজকর্মের তীব্র আপত্তি জানিয়ে ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনের দপ্তরে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছিলেন। দাখিলকৃত হলফনামার ভেতর অত্যন্ত সুচারুভাবে এই বিষয়টিরও সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে যে, দুই কমিশনারের যৌথ নির্দেশনার ফলেই মূলত ডেপুটি কমিশনারের আগের সেই নির্দেশিকাটি শেষ পর্যন্ত আর কার্যকর করা হয়নি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo