নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি ভোজনালয়ে অভিযান পরিচালনা করে প্রায় আড়াই হাজার লিটার বিভিন্ন ধরনের মদ্যজাতীয় পানীয় বাজেয়াফত করেছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা ইউনিট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে পরিচালিত চারটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই সাড়াঁশি অভিযানটি পরিচালিত হয়। গত রবিবার মধ্যরাতের ঠিক পরপরই শুরু হওয়া এই বিশেষ অভিযানটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং গভীর রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখা হয়।
তদন্তকারী দল সূত্রে জানা গেছে, ওই ভোজনালয়টির সাধারণ প্রদর্শনী কক্ষ ও নির্ধারিত গুদাম ঘরের পাশাপাশি বাইরে থাকা একটি বিশাল বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডের পেছনে তৈরি করা হয়েছিল অত্যন্ত সুকৌশলী একটি গোপন কুঠুরি। সরকারি নথিপত্র বা রেজিস্টারে কোনো ধরনের অন্তর্ভুক্তি ছাড়াই অবৈধভাবে সেখানে লুক্কায়িত রাখা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদের বোতল ও বিয়ার।
পরদিন দুপুরের দিকে রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় অবস্থিত কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন উক্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ। এ সময় তার সাথে মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর বিভাগের বিভিন্ন স্তরের গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানান যে, চলমান তল্লাশির সময় সেখানে উপস্থিত পোষা প্রাণী ব্যবহার করে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। ভোজনালয়টির নিয়মিত তাকে সাজানো পণ্যের তুলনায় শেলফে থাকা পানীয়ের পরিমাণ কম দেখা যাওয়ায় কর্মকর্তাদের মনে গভীর সন্দেহের উদ্রেক ঘটে। পরবর্তীতে সন্দেহজনক বিলবোর্ডটি সরানোর পর আড়ালে থাকা সেই গোপন কামরার সন্ধান পাওয়া যায়।
গোপন কামরাটি উন্মোচন করার সময় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চরম অসহযোগিতা করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ওই বিশেষ ঘরের কোনো চাবি সরবরাহ করা হয়নি এবং নানা ধরনের টালবাহানা ও কৌশলগত জটিলতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। তবে সরাসরি কোনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা হয়নি, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য বিশেষ করে বিভিন্ন পদের মদ্যজাতীয় সামগ্রী অবৈধ উপায়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বাজারে এনে বেচাকেনা করা হচ্ছে—এমন সুনির্দিষ্ট সংবাদের ভিত্তিতেই এই যৌথ অভিযান সাজানো হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল এসব পণ্যের সঠিক উৎসের সত্যতা যাচাই করা, বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়েছে কি না তা দেখা এবং লেনদেনকৃত অর্থ আয়কর নথিতে নিয়মিত প্রদর্শন করা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা।
কাস্টমস গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, এই অভিযানে বিভিন্ন নামী ব্রান্ডের প্রায় আট শ ছাব্বিশ লিটার বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন পদের প্রায় পনেরো শ তেত্রিশ লিটার বিয়ারও জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত শিভাস রিগ্যাল, ব্ল্যাক লেবেল, রেড লেবেল, জ্যাক ড্যানিয়েলস, গোল্ড লেবেল, গর্ডনস জিন এবং অ্যাবসলিউট ভদকা। এছাড়া হান্টার ও হাইনেকেনের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের বিয়ারও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী বাজেয়াফত করা এই সমস্ত পদের সামগ্রীর বাজারদর প্রায় বিরানব্বই হাজার টাকার কাছাকাছি। তবে এর সাথে প্রযোজ্য সব ধরনের শুল্ক ও কর যুক্ত করলে এই পণ্যগুলোর মোট আর্থিক অর্থমূল্য চার কোটি দুই লাখ টাকার বেশি বলে হিসাব করা হয়েছে। রাজস্ব বোর্ড স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই প্রতিষ্ঠানটির মদ আমদানির কোনো বৈধ নিবন্ধন ছিল না এবং অভিযানের সময় তারা কোনো বৈধ ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদ বা দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
রাজস্ব বোর্ডের আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট, ভ্যাট নিরীক্ষা ও তদন্ত অধিদপ্তর, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তরের চৌকস কর্মকর্তার দল এই যৌথ অভিযানে সরাসরি অংশ নেন। পুরো কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সাথে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের অর্থাৎ এসআরবি-১ এর বিশেষ দল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সাথে জড়িত চারজন পরিচালকের ব্যক্তিগত তথ্যও বর্তমানে নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
অভিযান চলাকালীন নিরাপত্তা সহায়তাকারী বাহিনী এসআরবি-১ এর প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোয়ামুল হালিম খান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, সরকারি সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধানের জন্যই তাদের একটি বিশেষ দল মাঠে সক্রিয় ছিল। অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান অঞ্চলের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান রাতে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন যে, এ ঘটনায় গুলশান থানায় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা রুজু করা হয়নি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo