নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের জন্য দান-সদকা কেবল একটি বরকতময় কাজই নয়, বরং এটি মানবসমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবধান কমিয়ে আনার একটি মোক্ষম উপায়। শুধু নিজের পকেট থেকে অর্থ খরচ করলেই দায়িত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে না, বরং কষ্টার্জিত ও বৈধ আয়ের সম্পদ সঠিক জায়গায় পৌঁছানোও ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কোন কোন খাতে সম্পদ ব্যয় করলে স্রষ্টার সন্তুষ্টি সর্বোচ্চ মাত্রায় লাভ করা সম্ভব এবং কোন কোন খাত থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত থাকা উচিত, সে বিষয়ে পবিত্র ধর্মগ্রন্থে সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রদান করা হয়েছে।
যেকোনো ধরনের দাতা তার সহায়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি হকদার হিসেবে বিবেচনা করবেন তার অসচ্ছল আত্মীয়স্বজন ও পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে দান এবং রক্তের সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার দ্বিগুণ পুণ্য অর্জন করা সম্ভব হয়।
পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে যে মানুষ যখন জানতে চায় তারা কী ধরনের ব্যয় করবে, তখন তাদের জানিয়ে দিতে হবে যে অর্জিত সম্পদ যেন পিতা-মাতা, ঘনিষ্ঠ জন, এতিম, দরিদ্র ও ভ্রমণকারীদের পেছনে ব্যয় করা হয়।
নবী করিম (সা.) জানিয়েছেন যে সাধারণ কোনো গরিব ব্যক্তিকে সহায়তা করলে কেবল একটি দানের সওয়াব পাওয়া যায়, পক্ষান্তরে কোনো আত্মীয়কে সেই সাহায্য করলে একই সঙ্গে দান এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার দ্বিগুণ সওয়াব অর্জিত হয়।
সমাজের কিছু মানুষ এমন রয়েছেন যারা চরম আর্থিক অনটনে জীবন যাপন করলেও নিজেদের আত্মসম্মান বোধের কারণে কখনো অন্যের কাছে হাত পাতেন না। কোরআনে এ ধরনের আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাদের হাতে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এছাড়া বিধবা নারী, পিতৃহীন শিশু এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদের যেকোনো ধরনের সহায়তা প্রদান করা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন একটি পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
নবীজি (সা.) উল্লেখ করেছেন যে বিধবা ও মিসকিনদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে যারা চেষ্টা চালায়, তারা যেন আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করা কোনো মুজাহিদ অথবা এমন ব্যক্তির সমতুল্য যে সারা দিন রোজা রাখে এবং পুরো রাত ধরে নফল ইবাদতে মশগুল থাকে।
একজন প্রকৃত বিশ্বাসীর উচিত এমন সব জনকল্যাণমূলক খাতে তার সম্পদ বিনিয়োগ করা, যা কেবল মানুষের ক্ষণস্থায়ী অভাবই দূর করে না, বরং পুরো সমাজকে দীর্ঘ মেয়াদে উপকৃত করে এবং দাতার মৃত্যুর পরও যার ধারাবাহিক সুফল অব্যাহত থাকে।
যেসব জনকল্যাণমূলক খাতে সহায়তার সুফল বহু দিন ধরে টিকে থাকে, ইসলামি পরিভাষায় সেগুলোকে সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে অভিহিত করা হয়। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সুপেয় পানির সুব্যবস্থা কিংবা জনহিতকর চিকিৎসালয়ে অর্থ প্রদান করলে মৃত্যুর পরও সেই আমল দাতার হিসেবে জমা হতে থাকে।
বিশিষ্ট পণ্ডিত ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি বর্ণনা করেছেন যে মুমিনের সম্পদ এমন কল্যাণময় কাজে ব্যয় করা বাঞ্ছনীয়, যা সমাজের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং মৃত্যুর পরও যার ফল চলমান থাকে।
অন্যদিকে, সমাজের যেসব মানুষ পেশাদার হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিয়েছে, ইসলামে কর্মক্ষম এই শ্রেণির মানুষের এই বৃত্তিকে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যারা এই পেশাকে বেছে নিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে প্রতারণা করে, তাদের কোনো ধরনের অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ অনুচিত, কারণ এর মাধ্যমে மறைமுகভাবে একটি সামাজিক অপরাধকে উৎসাহিত করা হয়।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন যে কোনো ধরনের প্রকৃত অভাব না থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি অন্যের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, সে মূলত নিজের জন্য আগুনের অঙ্গার বা ভক্ষ্য সংগ্রহ করছে।
বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার ইমাম নববি এই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন যে সুস্থ শরীর ও কাজ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে সম্পদ ভিক্ষা করে, তাদের কোনো কিছু দান করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।
সাহায্যপ্রদানকারী ব্যক্তির উচিত আবেগতাড়িত না হয়ে প্রকৃত অস্বচ্ছল ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলা দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে খুঁজে বের করে তবেই সহায়তা প্রদান করা।
এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড, নেশাদ্রব্য সেবন কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে।
কাউকে কোনো অর্থ দেওয়ার পর সেই ব্যক্তি যদি সেই সম্পদ ব্যবহার করে মাদক গ্রহণ করে কিংবা কোনো পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে, তবে সেই দানের বিপরীতে কোনো ধরনের পুণ্য অর্জিত হয় না।
পবিত্র কোরআনের অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে তোমরা সৎকর্ম এবং আল্লাহভীতির কাজে একে অপরকে সহায়তা করো, কিন্তু কোনো ধরনের পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে কখনো কাউকে সাহায্য কোরো না।
দান করার মূল উদ্দেশ্য হলো মহান স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা এবং মানবসমাজের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা। তাই যত্রতত্র অর্থ না ছড়িয়ে কিছুটা সময় ব্যয় করে সঠিক খাত বেছে নেওয়া একজন বুদ্ধিমান মুমিনের প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
এর মাধ্যমে দানের সম্পূর্ণ সুফল যেমন পুরো সমাজ ভোগ করে, তেমনি দাতার আমলনামাও পরিপূর্ণ পুণ্য ও সওয়াবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo