
নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
ফ্লাভিও বলসোনারোর পিতা তথা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো তখন অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে নিজগৃহে অন্তরীণ ছিলেন।
এর মাত্র দুই দিন বাদে রিও ডি জেনিরোর মূল এলাকায় আরও একটি ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে এ ধরনের আন্দোলন গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তার লাভ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং স্বয়ং লুলা উভয়েরই অভিমত, পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা এই বিক্ষোভগুলো তাঁর নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে নতুন প্রাণশক্তি জোগায় এবং রান অফ নির্বাচনে অভাবনীয় জয়ের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। রোববার সন্ধ্যায় বিজয় ভাষণে লুলা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থেকে গণতন্ত্র সুরক্ষায় রাজপথে নেমে আসা দেশের তরুণ প্রজন্মের উদার মানসিকতার জন্য আমি তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাবিও ভাসকনসেলোসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লুলার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পেছনে মূলত রাজপথের আন্দোলন, ভার্চুয়াল মাধ্যম তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ার এবং সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক সম্মিলিত অবদান ছিল। ব্রাজিলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল, যেখানে প্রথম ধাপের ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী চূড়ান্ত দফায় জয় ছিনিয়ে এনে আগের ধাক্কা বা পরাজয়কে সম্পূর্ণ উল্টে দিলেন।
ভোটগ্রহণের ঠিক আগের শেষ সপ্তাহগুলোতে বিজয়ী প্রার্থী লুলা অত্যন্ত সুচতুরভাবে একটি আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা প্যাকেজের অনুমোদন করান, যা তৎকালীন নির্বাচনী আচরণবিধির অনুমোদিত সীমার একেবারে শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে ফেলেছিল। এই বিশেষ প্যাকেজের মূল অন্তর্ভুক্তি ছিল দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনপদের পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রের প্রধানতম নগদ অর্থ সহায়তা প্রকল্পের অনুদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা এবং কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে নির্ধারিত সময়ের আগেই সেই আর্থিক বরাদ্দ প্রদান নিশ্চিত করা।
ফাবিও ভাসকনসেলোস হলেন ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পারানার মর্যাদাপূর্ণ ‘রিপ্রেজেন্টেশন অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক লেজিটিমেসি’ বা সহজ বাংলায় ‘প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বৈধতা’ শীর্ষক গবেষণা উইংয়ের একজন বিশিষ্ট গবেষক। তাঁর সুনির্দিষ্ট ভাষ্যমতে, এ ক্ষেত্রে রাজপথের গণআন্দোলন এবং ডিজিটাল দুনিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো প্রায় একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছিল।
এদিকে প্রথম দফার নির্বাচনের ঠিক দুই দিন পরেই লুলার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র ও কংগ্রেসের সম্মানিত সদস্য আন্দ্রে জানোনেস ‘লুলার আর্মি’ শিরোনামে একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন। উক্ত চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত অডিও ক্লিপ, ভিডিও এবং প্রতিদিন অন্তত কয়েক ডজন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা বার্তা সরবরাহ করতেন। এই ডিজিটাল বার্তাগুলো প্রেরণের মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে লুলাপন্থী প্রচারণামূলক কনটেন্টগুলোর ব্যাপক প্রচার এবং অনলাইন কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। জানোনেসের তৈরি করা ভিডিও ক্লিপগুলোর প্রারম্ভেই প্রায় নিয়মিতভাবে এই কথাটি উচ্চারিত হতো যে, বন্ধুরা, অতি জরুরি খবর!
উল্লেখ্য যে, অত্যন্ত জনপ্রিয় এই চ্যানেলটি খোলার প্রথম দিনের কার্যক্রম সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই এর সাবস্ক্রাইবার বা অনুসারীর সংখ্যা আকাশচুম্বী হয়ে ৬০ হাজারে গিয়ে ঠেকে। পরবর্তীতে নির্বাচনের দিন অর্থাৎ রোববার নাগাদ এই অনুসারী বা অনুসৃত মানুষের সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে ১ কোটির ল্যান্ডমার্ক ছাড়িয়ে যায়। ঠিক একই সময়ে ডিজিটাল বা অনলাইন মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৌড়গোড়ায় পৌঁছানোর লড়াইয়ে লুলা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বলসোনারোকে পেছনে ফেলে বহু দূর এগিয়ে যান। পরবর্তীতে রোববারের ঐতিহাসিক বিজয় ভাষণে লুলা তাঁর বিশ্বস্ত সহকর্মী আন্দ্রে জানোনেসকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘আমাদের জেনারেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর নিজের ভাষায়, জানোনেসের ওপর মূল দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল যেন তিনি প্রতিদিন আমাদের নেতাকর্মী ও সৈনিকদের মনের জোর ও মনোবল চাঙা রাখতে পারেন।
নির্বাচনী প্রচার-প্রসার চালাতে গিয়ে জানোনেসের নিরলস ও ক্লান্তহীন প্রচেষ্টার অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত ছিল ভোটগ্রহণের ঠিক আগের দিন ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে একটানা ২৪ ঘণ্টা ব্যাপী লাইভ বা সরাসরি সম্প্রচার পরিচালনা করা। কিন্তু অতিরিক্ত কাজের চাপ ও ধকল সহ্য করতে না পেরে গত সপ্তাহে তাঁকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হতে হয়। মূলত ভোটের আগের ওই দিনটিই ছিল একমাত্র ব্যতিক্রমী দিন, যেদিন উক্ত হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলটিতে কোনো ধরনের বার্তা বা আপডেট প্রকাশিত হয়নি।
অন্যদিকে, লুলার নিজস্ব নির্বাচনী প্রচার শিবিরও অনলাইন যোগাযোগ বা ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজির ক্ষেত্রে এক বিশাল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘ ৮১ বছর বয়সে পদার্পণ করতে চলা প্রবীণ নেতা লুলা ব্যক্তিগতভাবে নিজের কোনো মোবাইল ফোন না থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে নিজেই সেলফি ভিডিও রেকর্ড করার কাজ শুরু করেন। পরিশেষে রোববার রাতে তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, অবশেষে তাঁকে একটি আধুনিক মুঠোফোন উপহার দেওয়া হয়েছে। লুলা স্বীয় বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এখন থেকে আমি ব্রাজিলের সাধারণ নাগরিক ও জনগণের সঙ্গে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে কথা বলব, প্রতিদিন বহুবার সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করব।
বিশ্লেষক ভাসকনসেলোসের সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ক্রান্তিকালীন তিন সপ্তাহের ব্যবধানে রাজপথের গণজোয়ার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যাদুকরী প্রভাবে পরাজয়ের গভীর আশঙ্কা ও শঙ্কা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছিল।
সূত্র: আজকের পত্রিকা