
নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
গত ২৭ অক্টোবর লন্ডনের ঐতিহাসিক প্যালাডিয়াম থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জমকালো ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার বিতরণী আয়োজন। তারকা ফুটবলার ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের মিলনমেলায় গড়া এই মঞ্চে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডিঅর ট্রফি নিজেদের ঝুড়িতে পুরেছেন খ্যাতিমান ইংলিশ ফুটবলার হ্যারি কেইন। তারকাদের এই মিলনমেলার রঙিন লালগালিচায় উপস্থিতি দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফুয়াদ আবদুল–আজিজ। রোনালদো নাজারিও এবং হ্যারি কেইনের মতো বিশ্বমানের তারকাদের মুখোমুখি হয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া এই বাংলাদেশি তরুণের পরিচয় নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তৈরি হয়েছে প্রবল কৌতূহল।
নামটি অনেকের কাছে কিছুটা অপরিচিত মনে হতে পারে, তবে ব্রিটিশ রাজধানী লন্ডনের ফুটবলপ্রেমী কমিউনিটিতে ফুয়াদ আবদুল–আজিজ অত্যন্ত পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি মুখ। টেলিভিশন পর্দা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন চ্যানেল—সব জায়গাতেই তাঁর সরব উপস্থিতি এবং পরিচিত কণ্ঠস্বর নিয়মিতভাবে লক্ষ্য করা যায়।
ফুটবলভিত্তিক নানা সৃষ্টিশীল কনটেন্ট তৈরি করা ফুয়াদ আবদুল–আজিজের শেকড় রয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে, তাঁর জন্ম হয়েছিল সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলায়। তবে অত্যন্ত ছোটবেলার দিনগুলোতে পরিবারের সঙ্গে দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি লন্ডনেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলভাবে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি পেশাদার হিসেবে স্পোর্টস কনটেন্ট তৈরির দুনিয়ায় প্রবেশ করেন। এই কর্মজীবন শুরুর প্রারম্ভে তিনি মূলত সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেন।
নিজের সৃজনশীলতাকে এগিয়ে নিতে ২০১৮ সালে তিনি ‘ভাইপার স্পোর্টস’ নামের একটি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি মূলত ব্যাপক আলোড়নে আসেন। কার্যক্রমের শুরুর দিকে তিনি মূলত বক্সিং বিষয়ক বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করায় মনোনিবেশ করলেও বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনার প্রকোপ শুরু হলে তিনি বক্সিং ছেড়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দেন ফুটবলের ওপর।
করোনা পরবর্তী সময়ে তাঁর কাজের পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর কাজের জন্য ডাক আসতে শুরু করে। এই সময়ে তিনি বিবিসি, ওহ মাই গোল এবং ডাজোনের মতো আন্তর্জাতিক মানের গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ফুয়াদ তখন থেকেই একটি নিয়মিত ও পরিচিত মুখ হিসেবে নিজের স্থান পাকা করে নেন এবং বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ফুটবল বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘৪৩৩’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।
ফুয়াদ প্রথম সাধারণ বাংলাদেশিদের গভীর নজর কাটেন ফুটবলার কিউবা মিচেলকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি আকর্ষণীয় ভিডিওর মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি ফুটবলার হামজা চৌধুরীর ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনার সময় থেকেই ফুয়াদ তাঁর খেলাধুলার ওপর গভীর দৃষ্টি রাখতেন। এর পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের যেকোনো ম্যাচ উপভোগ করতে তিনি বিশ্বের মানচিত্রের নানা প্রান্তে নিজের খরচে উড়ে গেছেন।
একহাতে মাইক্রোফোন বা বুম হাতে নিয়ে যেমন তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, প্রিমিয়ার লিগ ও লা লিগার মতো মর্যাদাপূর্ণ ইউরোপীয় লিগের ম্যাচগুলো কভার করেছেন, ঠিক তেমনি লাল-সবুজের বাংলাদেশের ম্যাচ দেখতে সুদূর মালয়েশিয়ায় উড়ে যেতে দ্বিধা করেননি। আরব কাপের আসর থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ পর্যন্ত—মাইক হাতে পুরো ফুটবল দুনিয়া চষে বেড়ানোই তাঁর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে নিয়মিত ভিত্তিতে আকর্ষণীয় ও মানসম্মত ফুটবল কনটেন্ট তৈরি করতে দেখা যায় তাঁকে।
ব্রিটিশ খ্যাতনামা টেলিভিশন চ্যানেল ডাজোনের সৌজন্যেই ফুয়াদ আবদুল–আজিজকে এবারের ব্যালন ডিঅর আয়োজনের জাঁকজমকপূর্ণ লালগালিচায় যাওয়ার অভাবনীয় সুযোগটি দেওয়া হয়। এই জমকালো আয়োজনের লালগালিচায় অনুষ্ঠান শুরুর আগের পর্বের অনুষ্ঠানগুলোর মূল উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বিখ্যাত ট্রান্সফার মার্কেট বিশেষজ্ঞ ফাব্রিজিও রোমানোর মতো ব্যক্তিত্বের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে যৌথভাবে বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন ফুয়াদ। এমনকি এই বিশেষ লালগালিচায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং হ্যারি কেইনকে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করার দারুণ সুযোগটিও তিনি হাতছাড়া করেননি।
ফুয়াদ যে কেবল পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে ফুটবলারদের সাক্ষাৎকার নিয়েই নিজের কাজ শেষ করেছেন, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। বরং এই মহাতারকাদের আয়োজনে তিনি সঙ্গে করে একটি বিশেষ উপহারও নিয়ে এসেছিলেন। কুকুরেয়া, রদ্রি, কিলিয়ান এমবাপ্পে থেকে শুরু করে ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিওর মতো তারকাদের হাতে তিনি পরম যত্নে তুলে দিয়েছিলেন লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লাল রঙের ডাবল ডেকার বাসের একটি আকর্ষণীয় চাবির রিং বা স্যুভেনির।
ফুটবল বিশ্বের এই বিশাল মিলনমেলায় ফুয়াদের পরিধান করা পোশাকেও অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ব্যালন ডিঅরের মূল মঞ্চে তিনি যে মার্জিত ও সুন্দর স্যুট পরে উপস্থিত হয়েছিলেন, সেটির ঠিক কোটেই শোভা পাচ্ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজ জাতীয় পতাকার একটি সুন্দর কোট পিন। ফুয়াদ পৃথিবীর যে প্রান্তেই বা যে কোনো বড় আয়োজনেই যান না কেন, তিনি সবসময় নিজের হৃদয়ে ও বেশভূষায় প্রিয় বাংলাদেশকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে সঙ্গে নিয়েই পথ চলেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।