
নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
বিশেষজ্ঞ দল ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত শক্তিশালী টাস্কফোর্স আদালত কক্ষে আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্বলিত একটি বিশদ অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেছে। আজ মঙ্গলবার বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সময় বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হলে উচ্চ আদালত তা মঞ্জুর করে ছয় মাসের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করেন এবং আগামী ২৯ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন।
তদন্ত কার্যক্রমের বিশেষ পর্যবেক্ষণ অংশে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সুরতহাল প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে যে, নিহত সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির শরীরের কোনো প্রধান বা স্পর্শকাতর অঙ্গে উল্লেখযোগ্য গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অপরাধ সংঘটনের এই কৌশল কোনো পেশাদার খুনির কর্মপদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায় না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিকটিমদের দেহে অসংখ্য ছোটখাটো ক্ষতের উপস্থিতি থাকায় প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটেছিল, তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার করে প্রতীয়মান হয় যে তারা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পরও দীর্ঘক্ষণ বেঁচে ছিলেন। তাদের গলা, পিঠ এবং চোখের নিচের অংশে আঘাতের স্পষ্ট নিশানা ছিল এবং অপরাধস্থলের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে হামলাকারীরা কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো ছাড়াই অপরাধ সংঘটন করেছে।
প্রাপ্ত ডিএনএ প্রমাণের প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী দল জানিয়েছে যে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সাংবাদিক সাগরের হাত বাঁধার চাদর ও মেহেরুন রুনির পরিধেয় টি-শার্টের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দুটি ভিন্ন পুরুষ ব্যক্তির অজানা ডিএনএ নমুনা শনাক্ত করা হয়েছে। অপরাধী শনাক্তের এই প্রক্রিয়াটি আরও এগিয়ে নিতে সংগৃহীত নমুনা আমেরিকার দুটি বিশেষায়িত পরীক্ষাগারে পাঠানো হলেও মিশ্রণ মাত্রা অতিরিক্ত বেশি থাকায় কোনো স্পষ্ট প্রোফাইল বা ছবি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মামলার বিভিন্ন আলামত হিসেবে জব্দ করা অস্ত্র এবং ২৫ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির শরীরের সোয়াব সংগ্রহ করে একাধিক বিদেশি ল্যাবে পাঠানো হলেও পূর্বে প্রাপ্ত অজ্ঞাত ডিএনএর সঙ্গে সেগুলোর কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত সামগ্রিক ডিএনএ বিশ্লেষণ করলে সেখানে সর্বমোট চারজন ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়, যার মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী অন্তর্ভুক্ত। পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয় যে পুরুষ তিনজনের মধ্যে একজন নিহত সাংবাদিক সাগর নিজে এবং নারীজন হলেন মেহেরুন নাহার রুনি, তবে বাকি দুজন অজ্ঞাত পুরুষ আজও রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ কিংবা জড়িত অপরাধীদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় অদ্যাবধি পুরোপুরি উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে।
পারিবারিক বিরোধ কিংবা দাম্পত্য কলহের জেরে একজন অপরজনকে হত্যার পর নিজে আত্মহননের পথে হেঁটেছেন এমন কোনো শক্ত প্রমাণের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি তদন্ত দল। পেশাগত দ্বন্দ্বের কারণে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে থাকতে পারে কি না, সে বিষয়েও কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ মেলেনি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দম্পতিটি হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত মাস আগে জার্মানির প্রবাসজীবন শেষ করে দেশে ফেরেন এবং সাগরের শেষ কর্মস্থল মাছরাঙা টেলিভিশনের ঊর্ধ্বতন নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনা করেও কোনো ধরনের পেশাগত শত্রুতার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে এবং তারা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে ২০১৫ সালে, যা নিহত দম্পতির মৃত্যুর অনেক পরের ঘটনা হওয়ায় সামিট গ্রুপের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের দূরতম কোনো সংযোগ নেই। অর্থকড়ি কিংবা স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে কোনো বিরোধের জের ধরে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে গিয়েও কোনো সত্যতা পায়নি সংশ্লিষ্টরা। এমনকি গ্রামের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে পৈতৃক সম্পত্তি বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গেই কোনো ধরনের বিরোধ বা বিবাদ চলমান ছিল না।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, সিআইডি, পুলিশ সদর দপ্তর এবং র্যাবের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত যৌথ টাস্কফোর্সের ডসিয়বসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অপরাধের সময় খোয়া যাওয়া মোবাইল ফোনসেট ও দুটি ল্যাপটপ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মামলার অতীতের বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করা সাবেক পুলিশ প্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার, ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং র্যাবের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এখনও সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যায়নি। একই কারণে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি, তবে সাংবাদিক রুমী নোমানকে ডেকে ইতোমধ্যে তার জবানববন্দি রেকর্ড করা হয়েছে এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের মন্তব্যে আরও তুলে ধরা হয়েছে যে, গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি জানান যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসভবনে অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল আলামত জব্দ করেছে। জব্দকৃত এসব উপকরণের মধ্যে ছিল বিভিন্ন জিও লোকেশন, খুদে বার্তা এবং কল ডিটেইল রেকর্ডের প্রিন্টেড কপি, যা পরবর্তীতে তার একজন অর্ডারলি সেনাসদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যাচাই করা হয়।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক অনুসন্ধান চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং একজন পরিচিত মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন বলে গণমাধ্যমে বর্ণনা দেন। তার এই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেন। তারা জানান যে তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হওয়ার পর সংগৃহীত সব তথ্য ও উপাত্ত পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।
এই প্রেক্ষাপটে টাস্কফোর্সের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে বৈঠক করে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই-বাছাই করছেন বলে জানতে পেরেছেন। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্ত শেষ হবামাত্র সমস্ত নথিপত্র পিবিআইকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে গত ১৩ অক্টোবর চিফ প্রসিকিউটর বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক স্মারক চিঠি পাঠিয়ে তাদের হেফাজতে থাকা সমস্ত ডিজিটাল আলামত ও প্রাসঙ্গিক উপাত্ত তদন্তের স্বার্থে হস্তান্তরের জোরালো আবেদন জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য এসে পৌঁছায়নি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।