
নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ঘটলেও পড়ালেখার ময়দানে গণিত শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা একটুও ম্লান হয়নি, বরং এর প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ও গণিতবিদদের মতে, নতুন এই প্রযুক্তির যুগে শিক্ষার্থীদের ভাষার দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি গণিত চর্চায় বিশেষ মনোযোগী হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মানুষের মস্তিষ্কের যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা, গভীর বিশ্লেষণ করার শক্তি, জটিল সমস্যার সমাধান করার কৌশল এবং প্রযুক্তি সরবরাহ করা বিভিন্ন তথ্যের সঠিকতা যাচাই করার মূল ভিত্তি হলো এই বিজ্ঞান। সম্প্রতি প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষজ্ঞ গবেষক ও শিক্ষাবিদরা এই মতামত ব্যক্ত করেছেন।
গত ১৬ অক্টোবর বিখ্যাত কলামিস্ট সাইমন জেনকিনসের লেখা একটি সুনির্দিষ্ট নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর সেখানে ব্রিটিশ পাঠকদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া জমা পড়তে শুরু করে। পাঠকদের পাঠানো সেই চিঠিগুলো বিশ্লেষণ করেই শিক্ষাবিদদের এই সুচিন্তিত দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে এসেছে।
লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির সর্বোচ্চ পদে থাকা মার্ক চ্যাপলেইন এবং ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিকস অ্যান্ড ইটস অ্যাপ্লিকেশনসের প্রধান হিদার টিউকসবারি যৌথভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাঁরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক যুগে ক্যালকুলেটর বা উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে গাণিতিক শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেয়েছে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
মার্ক চ্যাপলেইন ও হিদার টিউকসবারির যৌথ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গণিত চর্চা মানেই কেবল গতানুগতিক হিসাব-নিকাশ কষা নয়। এটি মূলত মানবজাতিকে নিজস্ব যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করে গভীরভাবে চিন্তা করতে এবং যেকোনো প্রমাণের খুঁটিনাটি চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে শেখায়।
অচেনা ও নতুন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া কোনো উত্তরের সত্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করাও এই শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয়। যখন কোনো আধুনিক প্রযুক্তি চোখের পলকে এমন সব উত্তর প্রদান করে যা দেখে আপাতদৃষ্টিতে নিখুঁত ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তখন এই বিচারবুদ্ধির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
চিঠিগুলোতে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং ব্রিটিশ অর্থনীতিতে এই বিষয়ের বিশাল অবদানের স্পষ্ট পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে। একাডেমি ফর দ্য ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেসের একটি গবেষণামূলক বিশ্লেষণ টেনে চিঠিতে বলা হয়েছে যে অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এর ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৪ সালে সমগ্র যুক্তরাজ্য জুড়ে পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি সক্রিয় মানুষ সরাসরি গণিত কিংবা গাণিতিক বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন।
এই বিশাল কর্মীবাহিনী দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিভিএ খাতের সম্পূর্ণ মূল্যের প্রায় ১৯ শতাংশের সমান অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য প্রায় ৪৮৯ বিলিয়ন পাউন্ডে।
চিঠির মূল প্রণেতাদের জোরালো অভিমত হলো, দেশের নতুন প্রজন্মের তরুণ সমাজের জন্য ভাষার সাবলীল ব্যবহার শেখাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও তা কোনোভাবেই গাণিতিক যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা অর্জনের মূল্যের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।
তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আধুনিক যুগে মানবজীবনের সাফল্যের জন্য এই দুটি ভিন্ন দক্ষতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই আলোচনার পাশাপাশি প্রকাশিত অপর একটি চিঠিতে আরেকজন লেখক ভিন্ন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, মুখের ভাষা সাবলীলভাবে ব্যবহার করার দারুণ দক্ষতা তখনই সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রকৃত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে যখন তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সততা ও গভীর দায়িত্ববোধের মেলবন্ধন ঘটে।
এই সমস্ত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে চিঠিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কারিকুলাম নয়, বরং প্রতিটি বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠ্যক্রমে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ভালো আচরণ, নৈতিক সততা এবং আন্তরিকতার মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলিগুলোও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শিক্ষা দেওয়া উচিত।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।