নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
নারীকে ভোগ্যপণ্য বা বস্তু হিসেবে দেখার প্রাচীন ও ক্ষতিকর মানসিকতা নির্মূলের উপায় খুঁজতে নতুন এক গবেষণা পরিচালনা করেছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের দুটি ভিন্ন দলে ভাগ করা হয়েছিল এবং তাদের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী নিয়ে নানা পরীক্ষা চালানো হয়।
গবেষণার প্রথম দলটি প্রায় ১০ মিনিট ধরে মাথার ওপর মৃদু তড়িৎ তরঙ্গ বা বৈদ্যুতিক শকের মুখোমুখি হন। অন্যদিকে, তুলনামূলক বিচারের জন্য রাখা দ্বিতীয় বা প্লাসিবো দলকে সম্পূর্ণ ভুয়া চিকিৎসার আওতায় আনা হয়।
এই ভুয়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জন্য সামান্য কিছু সিগন্যাল দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের মধ্যে তড়িৎ উদ্দীপনা পাওয়ার একটি কৃত্রিম অনুভূতি তৈরি করা, যাতে তাদের মস্তিষ্কে কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বা বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত না হয়।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফলাফলে দেখা যায়, প্লাসিবো বা ভুয়া চিকিৎসা পাওয়া দলটি পুরুষদের সোজা ছবিগুলো অত্যন্ত সহজে ও সাবলীলভাবে চিনতে পেরেছে। কিন্তু যখন তাদের নারীদের ছবি দেখানো হয়, তখন তারা সেই একই সুবিধা বা দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হয়, যা মূলত জড়বস্তুর ছবি চেনার আচরণের সঙ্গেই পুরোপুরি মিলে যায়।
এর বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ১০ মিনিটের প্রকৃত তড়িৎ চিকিৎসা গ্রহণকারী দলটির ক্ষেত্রে। এই দলটি নারীদের সোজা ছবিগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শনাক্ত করতে পুরোপুরি সক্ষম হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রকৃত চিকিৎসা নেওয়ার ফলে পুরুষ এবং নারীর ছবি চেনার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভেতরে যে স্বাভাবিক পার্থক্য বা ব্যবধান তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সমাজের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিকের সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে যৌন হয়রানির প্রতি অনভিপ্রেত সহনশীলতা অন্যতম প্রধান একটি বিষয়।
এছাড়াও মানবদেহের রূপ ও গঠন নিয়ে অতিরিক্ত হীনমন্যতা বা বডি শেম, খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মজনিত মানসিক ব্যাধি বা ইটিং ডিসঅর্ডার এবং বিভিন্ন ধরনের অবসাদের মতো জটিল বিষয়ের সঙ্গেও এই যৌন পণ্যকরণ দৃষ্টিভঙ্গির গভীর সংযোগ রয়েছে।
এই পুরো গবেষণা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে অধ্যাপক সিভিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এর আগের বিভিন্ন গবেষণায় মূলত ছবির ধরন বদলে ফেলা হতো।
অথবা পর্যবেক্ষকদের নিজস্ব মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের নানা চেষ্টা চালিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাত ও ত্রুটি কমানোর দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
তবে বর্তমান এই গবেষণার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অভিনব একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবারই সর্বপ্রথম সরাসরি কোনো পর্যবেক্ষকের মস্তিষ্কের ভেতরে উদ্দীপনা প্রয়োগ করে দৃষ্টির এই অবচেতন রূপান্তরকে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণা চলাকালীন উভয় দলের অংশগ্রহণকারীকেই অবিকল একই ধরনের ছবি দেখানো হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছেন অধ্যাপক সিভিলে। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, মূল সমস্যাটি আসলে ছবির মধ্যে কোনো ত্রুটি থাকার কারণে তৈরি হয় না।
বরং আমাদের নিজস্ব মস্তিষ্ক কীভাবে ওই নির্দিষ্ট ছবিটিকে দেখছে এবং কীভাবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছে, তার ওপরই পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই গবেষণাটি মানবদেহের ভিজ্যুয়াল প্রসেসিং বা দৃষ্টিলব্ধ জ্ঞানের ভেতরে কীভাবে অদৃশ্য লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত জন্ম নেয়, তা অত্যন্ত গভীরভাবে বুঝতে গবেষকদের দারুণভাবে সহায়তা করবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
Daily Diner Alo