নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
দুই বছর আগে ২০২২ সালে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন ফুটবলের বরপুত্র পেলে। তবে এই কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের প্রতি ভক্তদের মনের গভীর ভালোবাসা আজও অমলিন রয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি অলিগলিতে তাঁর অগণিত অনুরাগী ছড়িয়ে আছেন। তাঁদেরই একজন হলেন খেলাধুলা সহায়তা নিয়ে কাজ করা সামাজিক প্রতিষ্ঠান শির উদ্যোক্তা শারমিন ফারহানা চৌধুরী।
ফুটবলসম্রাট পেলের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর। সর্বকালের সেরা এই ফুটবলারের জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষে একটি কেক নিয়ে সম্প্রতি প্রথম আলো কার্যালয়ে হাজির হন শারমিন। সেখানে সংবাদমাধ্যমটির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর তিনি প্রথম আলোয় কর্মরত ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন। এই আয়োজনে সবাই মিলে তাঁদের প্রিয় তারকাকে নিয়ে নানা স্মৃতি রোমন্থন করেন এবং পেলের প্রতি নিজেদের অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
শারমিনের কাছে পেলে কেবল একজন সাধারণ ফুটবলার নন, বরং তিনি এক গভীর আবেগের প্রতীক। পেলের জন্মদিনের এই অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাঁর গভীর অনুভূতির সঙ্গে পেলের নাম ওস্রোতে জড়িয়ে আছে এবং যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, এই আবেগ ঠিক তেমনই জীবন্ত ও অমলিন থাকবে।
পেলের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসার পাশাপাশি খেলাধুলার শক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মহৎ কাজের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন শারমিন। ২০১৬ সালে তিনি ‘স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্স বাংলাদেশ’ বা সংক্ষেপে ‘শি’ নামের একটি অলাভজনক সামাজিক উন্নয়নমূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে যাঁরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের সবাইকে সবুজ মাঠে ফিরিয়ে আনা এই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য।
দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক শিশু, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়মিত খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেয় শি। খেলাধুলার আনন্দময় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব মানুষের মনের ভেতর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা, নিজেদের লুকিয়ে থাকা সক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে বিকাশের উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা এবং সমাজের মূল স্রোতে এগিয়ে যাওয়ার পথে সহায়তা জোগায় এই সংগঠনটি।
বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, গাইবান্ধা ও শ্রীমঙ্গলসহ দেশের নানা প্রান্তে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে শি। কেবল ২০২৫ সালেই সংগঠনটির বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া কার্যক্রমে মোট ৫ হাজার ১৯২ জন মানুষ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছেন। এই বিশাল দলের মধ্যে ২ হাজার ৪৮৭ জনই ছিলেন কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী। এ ছাড়া এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন মোট ৪৫৬ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
সংগঠনটির নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দুর্দান্ত সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা ১৩ বছর বয়সী কিশোরী চৈতী রানি দেব। মাত্র ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার এই শারীরিক প্রতিবন্ধী কিশোরী গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে দেশের হয়ে স্বর্ণপদক অর্জন করে। আন্তর্জাতিক প্যারা গেমসের ইতিহাসে এটিই বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম কোনো স্বর্ণপদক জয়ের গৌরব।
শুধু দেশের গণ্ডির ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে শি। যেমন—২০২৪ সালের অক্টোবরের দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত হোমলেস ওয়ার্ল্ডকাপে বিশ্বের ৪০টি দেশের সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বাংলাদেশ দল। আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ হোমলেস ফুটবল দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছিল এই সংগঠনটি নিজেই।
শির অক্লান্ত সহায়তায় হোমলেস ওয়ার্ল্ডকাপে খেলার দুর্লভ সুযোগ পাওয়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তরুণ প্রেন চং ম্রো এখন দেশের জাতীয় ফুটবল দলের একজন গর্বিত খেলোয়াড়। এ ছাড়া সংগঠনটির আরও দুই কৃতি খেলোয়াড় আরিফ বিল্লাহ ও খাইরুল আলম নিজেদের নৈপুণ্যের জোরে জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় রাগবি দলে। এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, সামান্য সুযোগ পেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণেরাও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভা সফলভাবে তুলে ধরতে পারেন।
এ ছাড়া এশিয়ার প্রথম নারী ও জুনিয়র অ্যাম্পুটি ফুটবল দল গঠনের পেছনেও বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে এই সংগঠনটি। সেদিন শারমিনের সঙ্গে প্রথম আলো কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন শির ক্রীড়া উন্নয়নপ্রধান পাপ্পু লাল মোদক। খেলাধুলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার এই মহৎ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ সম্মাননাও পেয়েছেন শারমিন ফারহানা চৌধুরী। নারীর ক্ষমতায়ন ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলোর বিশেষ অনুষ্ঠানে সম্মানিত হওয়া নারীদের তালিকায় ছিলেন এই শি-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
Daily Diner Alo