ঢাকা | বঙ্গাব্দ

না হং-জিনের সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার হোপ: রহস্য ও বিপর্যয়ের গল্প

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 20, 2026 ইং
না হং-জিনের সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার হোপ: রহস্য ও বিপর্যয়ের গল্প ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

উত্তর কোরিয়া সীমান্তসংলগ্ন একটি ছোট্ট শহর হোপ হারবার। সেখানে একটি মৃত গরুর শরীরজুড়ে গভীর ক্ষত এবং চারপাশজুড়ে মাছির ভনভন দেখে পুলিশপ্রধান বিওম-সক শুরু করেন রহস্যের তদন্ত। তবে এই পশুর মৃত্যুর ঘটনাটি যে একটি ভয়ংকর বিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ, তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগে না। মুহূর্তের মধ্যে শহরজুড়ে লাশের সারি জমতে থাকে, ভবনের দেয়াল ধসে পড়ে এবং চারপাশ কানায় কানায় ভরে ওঠে গুলির শব্দ আর মানুষের আর্তনাদে। এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে তখন শুরু হয় তীব্র বাঁচার লড়াই। কোরীয় নির্মাতা না হং-জিনের পরিচালিত সায়েন্স ফিকশন ও অ্যাকশন ঘরানার এই চলচ্চিত্রটি শুরু থেকেই দর্শকদের এক অস্থির জগতের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে বিপদের সঠিক অবস্থান টের পাওয়ার আগেই বিপর্যয় ঘাড়ের ওপর চেপে বসে। প্রায় ১৬০ মিনিটের এই সিনেমায় এলিয়েনের সঙ্গে মানবজাতির সংঘাতের পাশাপাশি রয়েছে ডার্ক হিউমার, প্রচুর সহিংসতা এবং একের পর এক আকস্মিক ঘটনা। সব মিলিয়ে এই সিনেমাটি প্রথাগত দানবের গল্পকে পেছনে ফেলে অনেক বেশি বেপরোয়া এক অভিজ্ঞতা উপহার দেয়, যদিও দুর্দান্ত অ্যাকশনের এই মহড়া শেষ পর্যন্ত নিজের সমান গতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।

এক নজরে এই চলচ্চিত্রের বেশ কিছু তথ্য সামনে আসে। সিনেমার নাম ‘হোপ’, ধরন হলো সায়েন্স ফিকশন-অ্যাকশন-থ্রিলার এবং এর পরিচালক না হং-জিন। অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন হোয়াং জং-মিন, জুং হে-ইওন, জো ইন-সাং, মাইকেল ফাসবেন্ডার ও অ্যালিসিয়া ভিকান্দর। সিনেমাটি স্ট্রিমিং করা হচ্ছে অ্যাপল টিভি+ প্ল্যাটফর্মে রেন্ট হিসেবে এবং এর মোট দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।

চলচ্চিত্রটির সূচনা পর্ব অত্যন্ত জমজমাট। পরিচালক শুরুতেই কোনো দানবকে দর্শকদের সামনে এনে দাঁড় করান না। বরং ধ্বংসস্তূপ, একের পর এক মৃতদেহ, গুলির শব্দ এবং আতঙ্কিত মানুষের নানা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সেটির উপস্থিতি ফুটিয়ে তোলেন। বিওম-সক যখন শহরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি একের পর এক মৃতদেহ দেখতে থাকেন। নিজের পরিচিত মুখগুলোর লাশ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর পেশাদারি নির্লিপ্ততা ধীরে ধীরে ভেঙে খানখান হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি কিংবা যথেষ্ট পুলিশ সদস্য—কোনোটিই তাঁর হাতের কাছে নেই। ওদিকে বনের ভেতর রহস্যময় প্রাণীটিকে খুঁজে বের করতে শিকারি দলের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন তাঁরই আত্মীয় সুং-কি এবং অন্যরা। অন্যদিকে শহরে বিওম-সকের সঙ্গে যোগ দেন নবীন পুলিশ কর্মকর্তা সুং-এ। নিজের অদম্য দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতার জোরে তিনি চরম বিপদের মুখোমুখি হতে একটুও পিছপা হন না। তবে ওই প্রাণীটির আসল শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা যত বাড়তে থাকে, তাদের নিজেদের অসহায়ত্বও ততটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথম এক ঘণ্টা ধরে দানবকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রেখে টানটান আতঙ্ক তৈরির এই কৌশলটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। দর্শকরাও ঠিক চরিত্রগুলোর মতো অনুমান করতে থাকেন—এটি কি কোনো বাঘ, অন্য কোনো হিংস্র বন্য প্রাণী, নাকি পৃথিবীর বাইরের কোনো ভিনগ্রহের কিছু? রহস্যের জট পুরোপুরি খোলার আগেই পরিচালক একের পর এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পর্দার উত্তেজনা চমৎকারভাবে বজায় রাখেন।

‘হোপ’ সিনেমার সবচেয়ে উপভোগ্য দিকটি হলো এর দারুণ সব অ্যাকশন দৃশ্য। অত্যন্ত দ্রুতগতির গাড়ির ধাওয়া, ভয়ংকর সব ইউটার্ন, তীব্র বন্দুকযুদ্ধ, বড় ধরনের বিস্ফোরণ এবং দানবের আক্রমণ—সবকিছু এমন নিখুঁত ছন্দে সাজানো যে এই সিনেমাটি দর্শককে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তিতে বসে থাকার সুযোগ দেয় না। বিশেষ করে গাড়ির ধাওয়ার দৃশ্যগুলোতে ক্যামেরার নান্দনিক ব্যবহার সত্যিই চোখে পড়ার মতো। চলন্ত গাড়ির গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যামেরার গতিও যেভাবে সাবলীলভাবে বদলে যায়, তাতে দৃশ্যগুলো একই সঙ্গে ভীষণ উত্তেজনাপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।

চিত্রগ্রাহক হং কিয়ং-পিয়োর ক্যামেরার কাজ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর আগে ‘প্যারাসাইট’ ও ‘দ্য ওয়েইলিং’–এর মতো সফল সিনেমায় কাজ করা এই দক্ষ চিত্রগ্রাহক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও ক্যামেরা এমন নিপুণভাবে পরিচালনা করেছেন, যাতে দৃশ্যের গতি এবং স্থানিক ব্যাপ্তি দুটোই খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে চরিত্রগুলোর ছোটাছুটি, সরু রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটে চলা কিংবা একেবারে হঠাৎ করে আক্রমণের মুহূর্ত—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে নিবিড় যত্নের ছাপ।

অবশ্য এই চলচ্চিত্রটিকে কেবল একটি গম্ভীর অ্যাকশন থ্রিলার ভেবে ভুল করলে চলবে না। এর ভেতরে রয়েছে দারুণ সব অদ্ভুত কৌতুক, নানা উদ্ভট পরিস্থিতি এবং চরিত্রগুলোর সব হাস্যকর ভুলভ্রান্তি। কখনো তারা ভুলবশত কোনো নিরীহ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে বসে, আবার কখনো চরম বিপদের মধ্যেও এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয় যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে করে তোলে। রক্তপাত ও মৃত্যুর মতো অত্যন্ত ভয়াবহ ঘটনার পাশে এই ডার্ক হিউমার শুরুতে একটু অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। তবে পরিচালকের নির্দিষ্ট নির্মাণভঙ্গির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর এই বৈপরীত্যই সিনেমাটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিওম-সক চরিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনেতা হোয়াং জং-মিন এই সিনেমার ভার অনেকটাই নিজের শক্ত কাঁধে তুলে নিয়েছেন। গল্পের শুরুতে তাঁকে একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও আত্মবিশ্বাসী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে মনে হয়। কিন্তু পরিস্থিতি যখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের চিড় ধরে। ভয়, তীব্র হতাশা এবং কর্তব্যের টানে তৈরি হওয়া মানসিক টানাপোড়েন চরিত্রটিকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়। অভিনেতা হোয়াং জং-মিন চরিত্রের এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।

অন্যদিকে, সুং-এ চরিত্রে অভিনয় করে জুং হে-ইওন এই সিনেমার অন্যতম বড় চমক হিসেবে হাজির হয়েছেন। আলোচিত ‘স্কুইড গেম’ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী এখানে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতেও সমানভাবে সাবলীল। দুই হাতে অস্ত্র নিয়ে বিপদের দিকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সহকর্মীদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ানো—সব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের নজর কাড়ে। চরিত্রটির সাহসিকতার পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যে দৃঢ়তা, তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। একজন সফল অ্যাকশন তারকা হিসেবে হুয়নের যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, এই সিনেমাটি তারই এক বড় প্রমাণ।

সুং-কি চরিত্রে জো ইন-সাংও এই গল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন এবং তাদের মানসিক জগৎ সম্পর্কে দর্শকদের খুব বেশি জানার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সিনেমাটি তাদের গভীরভাবে চেনানোর চেয়ে মূলত চরম বিপদের মুখে তাদের দৈনন্দিন আচরণ তুলে ধরতেই বেশি আগ্রহী। ‘হোপ’ সিনেমার মূল গল্পের ভেতরে ধীরে ধীরে আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—অচেনা বা অজানা কাউকে দেখলেই কি তাকে সবসময় শত্রু বলে ভেবে নিতে হবে? উত্তর কোরিয়ার সীমান্তঘেঁষা ওই শহরটির বাসিন্দারা এমন এক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করেন, যেখানে অনুপ্রবেশকারী আর শত্রুর আশঙ্কা তাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অপরিচিত কাউকে সন্দেহ করা কিংবা নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা—এসব যেন তাদের স্বভাবের একটি স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছে।

রহস্যময় ওই প্রাণীটির আকস্মিক আবির্ভাবের পর এই মানসিকতা আরও বহুগুণ তীব্র হয়ে ওঠে। শহরবাসী প্রথমে এক মুহূর্তের জন্যও বোঝার চেষ্টা করে না যে প্রাণীটি আসলে কী চায় বা কেন এই পৃথিবীতে এসেছে। তাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে ভয় এবং আগ্রাসননির্ভর। কিন্তু গল্পের পরিধি যতই সামনের দিকে এগোতে থাকে, ততই এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে যাদের বিরুদ্ধে এই সাধারণ মানুষগুলো যুদ্ধ করে চলেছে, তাদের সম্পর্কেও আসলে অনেক কিছুই মানুষের অজানা রয়ে গেছে।

পরিচালক এখানে প্রচলিত অ্যাকশন চলচ্চিত্রের গতানুগতিক নায়কোচিত ধারণাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। সাধারণত এ ধরনের গল্পে মানুষ নিজের ঘরবাড়ি এবং পরিবারকে নিরাপদ রাখার জন্য কোনো দানবের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করে এবং দর্শকরাও তাদের এই বিজয়ের জন্যই শুভকামনা করেন। কিন্তু ‘হোপ’ সিনেমাটি সেই নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত অবস্থানকে মারাত্মকভাবে নড়বড়ে করে দেয়। মানুষের ভেতরের লোভ, সংকীর্ণ মানসিকতা এবং নিষ্ঠুর সহিংসতা যখন একে একে সামনে আসতে শুরু করে, তখন দর্শকের মনে অনিবার্যভাবে প্রশ্ন জাগে—তবে কি এই বিপদের প্রকৃত উৎস শুধু ওই অজানা প্রাণীটিই?

অবশ্য সিনেমাটি এই ভাবনাকে খুব একটা গভীর কোনো দার্শনিক আলোচনার স্তরে নিয়ে যায় না। বরং চরিত্রগুলোর নানামুখী আচরণ এবং গল্পের নানা অপ্রত্যাশিত মোড়ের মাধ্যমেই এটি দর্শকদের নিজের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই নির্দিষ্ট দিকটিই সিনেমাটিকে নিছক একটি সাধারণ দানব-শিকারের গল্পের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে নিয়ে গেছে।

সার্বিক বিচারে বেশ উপভোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ‘হোপ’ সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত দর্শকদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় সমস্যাটি লুকিয়ে রয়েছে এর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বা সিজিআইয়ের কাজে। বাস্তব লোকেশনে ধারণ করা দৃশ্যগুলো যেখানে বেশ প্রাণবন্ত এবং যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, সেখানে দানবের কিছু কিছু দৃশ্য তুলনামূলকভাবে বেশ দুর্বল ঠেকে। ফলস্বরূপ, যে ভয়ংকর প্রাণীকে ঘিরে গোটা চত্বরে এত রহস্য ও আতঙ্ক তৈরি হয়, পর্দায় তার উপস্থিতি সবসময় কাঙ্ক্ষিত মাত্রার প্রভাব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।

এর দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো এর অতিরিক্ত দৈর্ঘ্য। চলচ্চিত্রের প্রথম এক ঘণ্টায় যে অসাধারণ রহস্য ও টানটান উত্তেজনা দর্শকদের পর্দায় আটকে রাখে, ঠিক তার মাঝের অংশে এসে গল্পের গতি কিছুটা হলেও শ্লথ হয়ে পড়ে। বনের ভেতরে শিকারিদের অভিযান, প্রাণীটির সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিয়ে নানা ইঙ্গিত এবং একের পর এক অ্যাকশন দৃশ্য সামগ্রিক গল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে কখনো কখনো যেন একই বৃত্তে ঘোরাফেরা করে। বিশেষ করে কয়েকটি গাড়ির ধাওয়া ও সংঘর্ষের দৃশ্য প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা দীর্ঘ হওয়ায় উত্তেজনার সেই তীব্রতাও খানিকটা হ্রাস পায়।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আজকের দিনভর আলোচিত পাঁচ খবর ও নানা ঘটনা

আজকের দিনভর আলোচিত পাঁচ খবর ও নানা ঘটনা