নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
পূর্বাঞ্চলীয় জনপদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিতকে প্রান্তিক করে তোলার পেছনে অত্যন্ত ভয়ংকর এক অপকৌশল কাজ করেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনামলে পশ্চিমা প্রভুরা প্রাচ্য বা উপনিবেশবাদের শিকার হওয়া সমাজের সবকিছুকে একটিমাত্র সংকীর্ণ মানদণ্ডে পরিমাপ করত। তাঁদের দৃষ্টিতে এ অঞ্চলের নিজস্ব চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিপ্রযুক্তি কিংবা স্থাপত্যকলার চর্চা ছিল পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক ও অনুন্নত। দীর্ঘ সহস্রাব্দের পরীক্ষামূলক ও সফল দেশীয় কৃষিপদ্ধতিকে এক কলমের টানে বাতিল করে তাঁরা নিজেদের স্বার্থান্ধ ব্যবস্থা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেন। পশ্চিমা গবেষকেরা এমন একটি মতবাদ সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে কেবল তাঁদের নিজস্ব জ্ঞানকেই একমাত্র আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করা হতো। উপনিবেশের শিকার সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে অত্যন্ত সুচারুভাবে এই ধারণা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে তাঁদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা বা চিন্তার কোনোই মূল্য নেই এবং সবকিছুই নতুন করে শিক্ষা নিতে হবে শ্বেতাঙ্গ কর্তাদের কাছ থেকে। এই তীব্র মানসিক নির্যাতনের ফলে মানুষ ধীরে ধীরে তার নিজস্ব শেকড় এবং ঐতিহ্য থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
সাংস্কৃতিক হামলার পাশাপাশি এই অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রমও সমানতালে চলতে থাকে। শতবর্ষপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভূমিব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বাতিল করে ঔপনিবেশিক শাসকেরা নিজেদের সুবিধার স্বার্থে সম্পূর্ণ নতুন আইন প্রবর্তন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো ক্ষতিকর নীতি কৃষকদের তাঁদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও জমি থেকে জবরদস্তি উচ্ছেদ করে নিঃস্ব ভূমিদাসে রূপান্তরিত করেছিল। স্থানীয় সমাজ পরিচালনার প্রাচীন পঞ্চায়েত বা গোত্রভিত্তিক শাসনপদ্ধতিকে ভেঙে চুরমার করে সেখানে পশ্চিমা আদলের আমলাতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া হয়। এ দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতি ও সাধারণ কারিগরদের ওপর নির্মম ও অমানবিক করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে স্থানীয় সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্পকে চিরতরে ধ্বংস করা হয়। এর ফলে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা এবং ঐক্যের দুর্ভেদ্য বুননগুলো পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল।
সংস্কৃতির সবচেয়ে ফুটিয়ে তোলা ও দৃশ্যমান রূপ হিসেবে শিল্পকলা এবং স্থাপত্যকর্ম সবসময়ই সামনে আসে। উপনিবেশ স্থাপনকারীরা এ দেশের এই নান্দনিক শিল্পকর্মগুলোকে কেবল লুটপাটের বস্তু হিসেবেই বিবেচনা করেছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার অমূল্য পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ও অলংকার রাতের অন্ধকারে চুরি করে ইউরোপের নানা দেশের জাদুঘরগুলোতে পাচার করা হয়। নাইজেরিয়ার বেনিনের ব্রোঞ্জের তৈরি অমূল্য নিদর্শনগুলো আজও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্যালারির শোভাবর্ধন করে চলেছে, আর ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত কোহিনূর হীরা সংরক্ষিত আছে লন্ডনের টাওয়ার অব লন্ডনে, যেখানে তা ব্রিটিশ রাজপরিবারের মুকুটে খচিত রয়েছে। লুণ্ঠিত এই ঐতিহাসিক সম্পদগুলো তাদের আসল মালিকদের কাছে ফেরত পাওয়ার দাবি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও নানা জটিল আইনি মারপ্যাঁচ এবং টালবাহানার কারণে সেই ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আজও তাদের প্রকৃত মালিকদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
Daily Diner Alo