নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পরবর্তী সময়ে নয়াদিল্লি মস্কো থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান আমদানিকারক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন বায়ু গবেষণা কেন্দ্রের (সিআরইএ) পরিসংখ্যান অনুসারে, বিগত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত মস্কো থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৩৭ শতাংশেরই অন্তিম গন্তব্যস্থল ছিল ভারত।
মস্কো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের এই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় শোধনাগারগুলোর মধ্যে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডও অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের আগস্টের দিকে ভারতীয় পণ্যের ওপর বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্ক বসান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন বা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার ফলে সামগ্রিক শুল্কের বোঝা বেড়ে গিয়ে শতকরা ৫০ ভাগে উন্নীত হয়েছিল।
যদিও পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটন সেই শাস্তিমূলক অতিরিক্ত শুল্কের সিদ্ধান্ত বাতিল করে নেয়, তথাপি ভারতের মস্কো থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এখনো উদ্বেগের বড় কারণ। অন্যদিকে, নিজ দেশের বিশাল জনসংখ্যার জন্য একটি সাশ্রয়ী মূল্যের ও নির্ভরযোগ্য শক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করাকেই নিজেদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে দাবি করে আসছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
চলতি মাসের একেবারে প্রারম্ভে মার্কিন প্রশাসন নিজেই সাময়িকভাবে রুশ ডিজেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে, যার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকদের অভিমত হলো—জামনগরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর এই সফরটি যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিবিধ উদ্দেশ্য সাধনের প্রচেষ্টার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ওয়াশিংটনের এই বহুমুখী কৌশলের প্রথম লক্ষ্যটি হলো নয়াদিল্লির মস্কো-নির্ভরতা হ্রাস করা, দ্বিতীয়ত ভেনেজুয়েলা ও খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে উৎসাহিত করা এবং পরিশেষে একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে শক্তি খাতের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পেছনে বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আম্বানি পরিবারের সঙ্গে মার্কিন উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকের নেপথ্যে দুটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কাজ করেছে।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা থেকে আরও অধিক পরিমাণে জ্বালানি তেল পরিশোধন করার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে প্রস্তাবিত নতুন শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পে রিলায়েন্সের বিনিয়োগের আগ্রহ অক্ষুণ্ণ আছে কি না, সে বিষয়ে পাকাপোক্ত নিশ্চয়তা লাভ করা।
উল্লেখ্য যে, বিগত মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল বন্দরে একটি বিশালাকার তেল শোধনাগার নির্মাণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের কথা ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় তাঁর দাবি ছিল যে এটি হবে বিগত অর্ধশতকের মধ্যে মার্কিন ভূখণ্ডে নির্মিত সর্বপ্রথম সর্ববৃহৎ কোনো নতুন তেল শোধনাগার।
তবে এই মেগা প্রকল্প সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি জনসমক্ষে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। এমনকি এই প্রকল্পটির সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা কিংবা এর নির্মাণকাজ ঠিক কোন সময়ে শুরু হতে পারে, সে সম্পর্কেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, টেক্সাসের এই প্রস্তাবিত শোধনাগারটি ভেনেজুয়েলা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তেল ব্যবস্থার মতো হয়তো মার্কিন কৌশলগত স্বার্থে এই মুহূর্তে ঠিক ততটা তাৎক্ষণিক গুরুত্ব বহন নাও করতে পারে। তবুও সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পটিকেও পুরো ঘটনার একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
Daily Diner Alo