ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সের ২৫ শহরে চলছে চলচ্চিত্র পথের বন্ধুর শুটিং

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2026 ইং
ফ্রান্সের ২৫ শহরে চলছে চলচ্চিত্র পথের বন্ধুর শুটিং ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে মোট পঁচিশটি ভিন্ন শহরে কৃত্রিম কোনো সেট ছাড়াই একদম বাস্তব প্রাকৃতিক ও উন্মুক্ত পরিবেশে ক্যামেরা বন্দি হচ্ছে নতুন চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ সময় ঠিক মঙ্গলবার দুপুরে যখন নির্মাতা স্বপন আহমেদের সঙ্গে ফোনালাপে যোগাযোগ করা হয়, তখন তাঁদের শুটিংয়ের গাড়িটি দ্রুত গতিতে আরেকটি নতুন লোকেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর ঠিক আগের দিন মধ্যরাতের কিছু সময় পরে ছবির কাজের বিরতিতে তাঁর সঙ্গে খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে কথা বলা সম্ভব হয়েছিল। সেই সময় নির্মাতা জানিয়েছিলেন যে ওই দিনের নির্ধারিত ক্যামেরার কাজ শেষ হতে রাত দশটা বাজবে এবং পরের দিন সূর্য ওঠার আগেই শিল্পীদের সকালের কলটাইম দেওয়া রয়েছে। এই কারণে ব্যস্ততার জেরে মুঠোফোনে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জানা যায় যে পুরো শুটিং ইউনিট একসঙ্গে সুদূর আরেকটি নির্ধারিত লোকেশনের উদ্দেশ্যে গাড়িতে রওনা হয়েছে। দীর্ঘ সেই যাতায়াতের ফাঁকে সময় বের করে ছবির কলাকুশলী ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ মিলেছিল।

বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগ ও প্রযোজনায় রূপ লাভ করছে ‘দ্য অরেঞ্জ’ নামের এই চলচ্চিত্রটি, যার বাংলা শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘পথের বন্ধু’। স্বপন আহমেদের পরিচালনায় তৈরি হওয়া এই সিনেমাটিতে প্রধান কয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করছেন তৌকীর আহমেদ, ফাইজুল ইয়ামীন এবং স্বর্ণালি চৈতী। ফ্রান্সে চলমান এই কাজের জন্য কোনো ধরনের আলাদা বা কৃত্রিম স্টুডিও সেট নির্মাণ করছেন না নির্মাতা স্বপন। নদীর ধার ঘেঁষে থাকা বসার বেঞ্চ, ব্যস্ত রাস্তার পাশ, কোনো ছোট শহরের অলিগলি কিংবা চলমান গাড়ি—চিত্রনাট্যের ঠিক যেখানে যে ধরনের দৃশ্যের প্রয়োজন পড়ছে, ক্যামেরা সেখানেই স্থাপন করা হচ্ছে। এক শহর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অন্য শহরে যাওয়ার সময় চারপাশের দৃশ্যপটও প্রাকৃতিকভাবে বদলে যাচ্ছে, আর ফ্রান্সের নতুন নতুন জনপদ ও এলাকাগুলো সিনেমার মূল কাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে অভিনেতা তৌকীর আহমেদ জানান যে তাঁদের ধারণকাজের একটা বড় অংশই সম্পন্ন হচ্ছে শহরের মূল সীমানার বাইরে। বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি কিছুটা হেসে মন্তব্য করেন যে তাঁরা প্যারিসের কোনো ব্যস্ত শাহবাগে নন, বরং সাভার, পুবাইল, রংপুর কিংবা কক্সবাজারের মতো পরিবেশে শুটিং করছেন।

নির্মাতা স্বপন আহমেদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ফ্রান্সকে সাধারণ পর্যটকদের কাছে পরিচিত কোনো সুন্দর পোস্টকার্ডের মতো করে পর্দায় তুলে ধরতে চান না তিনি। এমনকি এই সিনেমায় বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের সৌন্দর্যের কোনো দৃশ্যও রাখা হচ্ছে না। পরিচালকের মূল আগ্রহ সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবন ও ফ্রান্সের বাস্তব চিত্র নিয়ে। সেই কারণেই সিনেমার লোকেশন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে সাধারণ রাস্তাঘাট, কোলাহলপূর্ণ বাজার, ছোট ও মফস্বল শহর, গ্রাম এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলো। তিনজন ভিন্ন অভিবাসীর জীবনের দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে শহুরে জীবন থেকে শুরু করে গ্রাম এবং পরবর্তীতে সমুদ্র পর্যন্ত ফ্রান্সের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতিও গল্পের পটভূমি ও অংশ হয়ে উঠবে।

বাইরে বা রিয়েল লোকেশনে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের পরিমাণও নেহাত কম নয়। প্রতিদিন নতুন নতুন স্থানে যাতায়াত করতে হচ্ছে, একই সঙ্গে সামাল দিতে হচ্ছে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি ও সময়ের হিসাব। তবে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং পুলিশ বিভাগের আন্তরিক সহযোগিতার কারণে এই কঠিন কাজটি কিছুটা সহজ হচ্ছে বলে জানান পরিচালক। এমনকি যে সমস্ত শহরে চিত্রগ্রহণ চলছে, সেখানকার স্থানীয় মেয়ররাও মাঝেমধ্যে কৌতূহলী হয়ে শুটিং স্পটে উপস্থিত থাকছেন।

‘পথের বন্ধু’ সিনেমার পুরো গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন প্রবাসী বাঙালি যার নাম নাসির। ফ্রান্সে অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করছেন এবং রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে খেলনা বিক্রি করাটাই তাঁর প্রধান পেশা। বর্তমান ঠিকানা প্যারিস হলেও জীবিকা নির্বাহের তাগিদে খেলনা বিক্রির উদ্দেশ্যে তাঁকে শহর থেকে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে পাড়ি জমাতে হয়। তাঁর বিশ্বস্ত সহকারী শৈবাল চরিত্রে অভিনয় করেছেন উদীয়মান শিল্পী ফাইজুল ইয়ামীন। অন্যদিকে নদী নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রূপদান করছেন অভিনেত্রী স্বর্ণালি চৈতী।

গল্পের নেপথ্য প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পরিচালক স্বপন আহমেদ আলোকপাত করে জানান যে এটি মূলত নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার একটি সাধারণ পরিবারের কাহিনি। প্রলয়ংকরী নদীভাঙনের কবলে পড়ে তাদের আস্ত গ্রামটি একসময় চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘ বারো বছর পর নিজ দেশে ফিরে নাসির দেখতে পান চারপাশে সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া এক নির্মম বাস্তবতা। কাহিনীর একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয় তরুণী নদীর। পরবর্তীতে সিনেমার দর্শকরা জানতে পারবেন যে এই তরুণী আর কেউ নন, স্বয়ং নাসিরের নিজেরই মেয়ে। তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে বা কীভাবে বাবা-মেয়ের এই সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটে, সেটাই এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় গল্প রহস্য।

অভিনেতা তৌকীর আহমেদের কাছে নাসির চরিত্রটিতে অভিনয় করা সম্পূর্ণ নতুন এবং ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা। এই প্রসঙ্গে তৌকীর বলেন যে দর্শকরা তাঁকে অতীতে নানা ধরনের চরিত্রে দেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এর ফলে শিল্পীর একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি বা ইমেজ দর্শকদের মনে তৈরি হয়ে যায় এবং শিল্পী সেই গণ্ডির মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েন। সেই পরিচিত বলয় থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভালো কোনো চরিত্রে কাজ করাটা অবশ্যই বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তাঁর জোরালো বিশ্বাস, যেকোনো চরিত্রের ক্ষেত্রে কেবল বাইরের রূপায়ণ নয়, বরং চরিত্রের ভেতরের আত্মাকেও সঠিকভাবে খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

এর আগে ‘জালালের গল্প’, ‘কমলা রকেট’ কিংবা ‘রূপকথার গল্প’র মতো অত্যন্ত পরীক্ষামূলক ও ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে তৌকীরের ঝুলিতে। বর্তমান সময়ে এসে ইউরোপীয় কলাকুশলীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার এই সুযোগটি তাঁকে নতুন করে অনেক কিছু শেখার পথ খুলে দিচ্ছে।

ফাইজুল ইয়ামীন এবং স্বর্ণালি চৈতীর কাছেও ‘পথের বন্ধু’ সিনেমায় কাজ করাটা সম্পূর্ণ অন্য রকম একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। ফাইজুলের অভিনয় জীবনের এটি মাত্র তৃতীয় চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি নির্মাতা রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ এবং ওয়াহিদ আনামের ‘তাজমহল’ নামের দুটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। জীবনের প্রথমবার ফ্রান্সে এসে প্রতিদিন সম্পূর্ণ নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে শুটিং করার এই অভিজ্ঞতাকে তিনি অনেকটা চমৎকার কোনো ভ্রমণের সঙ্গে তুলনা করে বলেন যে কেবল শুটিং নয়, মনে হচ্ছে পুরো ফ্রান্স দেশটাই তাঁর দেখা হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পরিচালক স্বপন আহমেদের কাজের নিজস্ব ধরন তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর মতে, স্বপন আহমেদ শিল্পীদের অভিনয়ের জন্য যথেষ্ট স্বাধীন জায়গা প্রদান করেন এবং চরিত্র ও দৃশ্য নিয়ে কলাকুশলীদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে, যার ফলে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগ ঘটছে।

স্বর্ণালি চৈতীর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের এটি পঞ্চম কাজ। তিনি এর আগে প্রথম অভিনয় করেছিলেন রতন পালের পরিচালনায় ‘অন্তরখোলা’ চলচ্চিত্রে। এরপর একে একে তিনি নুর ইমরান মিঠুর ‘কুরকাব’, এন রাশেদ চৌধুরীর ‘সখী রঙ্গমালা’ এবং রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’ সিনেমায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দেন। ‘পথের বন্ধু’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি এই প্রথম দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিনেমার শুটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন। এদিকে ছবির নারী নির্বাহী প্রযোজক মালিহা আহমেদের অত্যন্ত আন্তরিক সহযোগিতার কারণে তিনি বিদেশে থেকেও নিজের দেশের মানুষের খুব কাছাকাছি থাকার একটা দারুণ অনুভূতি পাচ্ছেন বলে জানান। স্বর্ণালি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন যে বিন্দুমাত্র মনে হচ্ছে না তিনি দেশের বাইরে অচেনা কোথাও শুটিং করছেন, বরং মনে হচ্ছে আপন কোনো মানুষ তাঁকে পরম যত্নে আগলে রেখেছেন।

‘লাল টিপ’ এবং ‘পরবাসিনী’র পর এটি নির্মাতা স্বপন আহমেদের পরিচালনাধীন তৃতীয় চলচ্চিত্র। তাঁর আগের দুটি সিনেমা বাণিজ্যিক ধারার বলয়ে নির্মিত হলেও এবার তিনি সম্পূর্ণ নিজের পছন্দসই চলচ্চিত্রভাষার মাধ্যমে মনের মতো করে গল্প ফুটিয়ে তুলতে চান। মূলত প্রবাসজীবনের নির্মম বাস্তবতা, টিকে থাকার অন্তহীন সংগ্রাম এবং মানুষের মধ্যকার জটিল সম্পর্কগুলোকে কেন্দ্র করেই এই সিনেমাটি সাজানো হয়েছে।

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে এই চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করছে ফ্রান্সের স্বনামধন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মোমার্ত মোশন পিকচার্স ও শ্যানন ইন্টারন্যাশনাল। এছাড়া এই ছবির সহযোগী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত রয়েছে ফ্রান্সেরই অপর একটি প্রতিষ্ঠান বাগার প্রোডাকশনস। আগামী ২ নভেম্বরের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো শুটিংয়ের কাজ সাফল্যের সঙ্গে শেষ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর সিনেমাটি বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জমাদায়ের জন্য পাঠানো হবে। এরপর বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা দেশের প্রেক্ষাগৃহে এটি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সু চিসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি চাইলেন ছোট ছেলে

সু চিসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি চাইলেন ছোট ছেলে