নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিফটি বেডের বিপরীতে বিগত আঠারো অক্টোবর ৩১ জন ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। বর্তমান বছরটিতে এখন পর্যন্ত সর্বমোট পাঁচশত বত্রিশ জন রোগী এই কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। পূর্বে কখনো এই হাসপাতালে এত অধিক সংখ্যক রোগী ভর্তি হয়নি বলে জানিয়েছেন মোংলার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন। তিনি জানান, কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা দিয়ে এই রোগের প্রকৃত ভয়াবহতাসূচক চিত্র সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়, কেননা বর্তমান পরিস্থিতি এর চেয়েও বহুগুণ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
মোংলা উপজেলার এই সামগ্রিক চিত্র মূলত সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তব অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে। অতীতে রাজধানীভিত্তিক সমস্যা হিসেবে পরিচিত থাকলেও ডেঙ্গু এখন দেশব্যাপী জেঁকে বসেছে, যার মধ্যে উপকূলীয় জনপদে এর আক্রমণ সবচেয়ে বেশি তীব্র। চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় চল্লিশ শতাংশই এসেছে উপকূলীয় উনিশটি জেলা থেকে। বাংলাদেশ দুই হাজার সালে এই ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হওয়ার পর থেকে উপকূলের জেলাগুলোতে কখনোই এত বিপুল পরিমাণে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা যায়নি।
উপকূলীয় অঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব এতটা প্রকট আকার ধারণ করার পেছনে সরকারি পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি। তবে বিভিন্ন গবেষক, কীটতত্ত্ববিদ, চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাদের নিজস্ব কিছু ধারণার কথা তুলে ধরেছেন। এসব সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে অঞ্চলটি অপেক্ষাকৃত নতুন সংক্রমণস্থল বা ভার্জিন এরিয়া হওয়া, সুপেয় পানির তীব্র ঘাটতির কারণে বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখা, স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধি না থাকার ফলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অবহেলা ও জলাবদ্ধতা এবং কৃষি খাতের নানা প্রাকৃতিক আধার।
গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উপকূলের উনিশটি জেলার চিকিৎসালয়গুলোতে চুয়াত্তর হাজার একশত আটচল্বীশ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছেন, যা মোটের প্রায় উনচল্লিশ দশমিক ছয় শতাংশ। একই সময়ে সারা দেশের হাসপাতালে মোট রোগী ভর্তি হয়েছিল এক লাখ দশ হাজার তিনশত বারো জন। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে উপকূলীয় এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল সাতান্ন হাজার পাঁচশত বায়ান্ন, যেখানে দেশজুড়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ একাত্তর হাজার একশত ঊনআশি। অর্থাৎ, সে বছর উপকূলীয় অঞ্চলের অংশ ছিল ত্রিশ দশমিক চার শতাংশ।
এর পাশাপাশি, দুই হাজার পঁচিশ সালে উপকূলের জেলাগুলোতে পঁয়ত্রিশ হাজার পাঁচশত এগারো জন রোগী ভর্তি হয়েছিল এবং দেশের মোট আক্রান্ত ছিল এক লাখ দুই হাজার তিনশত আটান্ন জন, যার প্রায় চৌত্রিশ দশমিক সাত শতাংশ ছিল উপকূলের। তবে আগের বছরের হিসাব পুরো সময়ের হলেও চলতি বছরের পরিসংখ্যানটি মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত প্রযোজ্য। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, হাসপাতালের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সংগৃহীত এই তথ্যের বাইরেও রোগীর প্রকৃত আবাসস্থল বা সংক্রমণের আসল স্থান সবসময় স্পষ্ট হয় না, যার ফলে উপকূলে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।
মশার বিস্তার প্রসঙ্গে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার উল্লেখ করেন যে, রাজধানী থেকে শুরু হওয়া এই রোগটি ক্রমান্বয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো একটি এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে গেলে ভাইরাসটি নতুন এলাকা খুঁজতে থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলে এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য তুলনামূলক বেশি অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় সেখানে এর বিস্তার ঘটেছে। মোংলা হাসপাতালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এখানকার পঞ্চান্ন শতাংশের বেশি রোগীই মোংলা পৌর এলাকার বাসিন্দা। ডা. মো. শাহীন জানান, এই অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র অভাব রয়েছে এবং মানুষ যেকোনো উপায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে থাকে, যা এই মশার প্রজননস্থল হিসেবে কাজ করছে।
পৌর এলাকায় যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় মোংলা পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়ন সদরে জলাবদ্ধতা একটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ডা. শাহীন আরও জানান যে, স্থানীয় পৌরসভা কিংবা ইউনিয়নগুলো বর্তমানে জনপ্রতিনিধিশূন্য অবস্থায় রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের বিষয়ে তদারকি করার মতো কেউ নেই। প্রসঙ্গত, এ বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট তিনশত বিয়াল্লিশ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে একা উপকূলের উনিশ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মারা গেছেন একশত সতেরো জন। এছাড়াও ঢাকার হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবাই ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন, তাদের মধ্যে উপকূলের মানুষ থাকাও স্বাভাবিক।
পরিস্থিতি মূল্যায়নে চলতি বছরের আগস্ট মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বরগুনা জেলায় এডিস মশার ওপর একটি বিশেষ জরিপ পরিচালনা করে। ঐ জরিপে বিভিন্ন বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের পানি জমে থাকা একশত চৌত্রিশটি পাত্র পরীক্ষা করে ছাব্বিশটিতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়। শূককীটের উপস্থিতির মাত্রা নির্ধারণে ব্রুটো ইনডেক্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক, যেখানে মান কুড়ি অতিক্রম করলে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। সেই জরিপের ফলাফল অনুযায়ী বরগুনায় ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গিয়েছিল তিপ্পান্ন দশমিক শূন্য ছয়।
জরিপের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, সুপেয় পানির সংকট এবং গভীর নলকূপের পানির সীমিতলভ্যতার কারণে স্থানীয় জনসাধারণ ড্রামে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখতে বাধ্য হন। পাশাপাশি বাড়ির চারপাশে পানি জমে থাকার বিপজ্জনক বিষয় এবং মশার প্রজনন ক্ষেত্র সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও এই পতঙ্গের বংশবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস জানান যে, বরগুনার পাশাপাশি পিরোজপুর জেহলাতেও অনুরূপ জরিপ চালানো হয়েছে এবং সেখানে সুপেয় পানির সংকটের পাশাপাশি বিশেষ করে সুপারি গাছের খোলে ও ফুলের নার্সারিতে ব্যাপক পরিমাণে এডিসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার প্রধানত ইজিপ্টাই ও অ্যালবোপিকটাস নামের দুটি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ইজিপ্টাই প্রজাতির মাধ্যমেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই রোগ ছড়ায়। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক রোগী আক্রান্ত হলেও সেখানে অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার উপস্থিতি অত্যন্ত লক্ষণীয় মাত্রায় পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, আগস্ট মাসে বরগুনায় পরিচালিত আইইডিসিআরের জরিপে প্রায় আটান্ন শতাংশ অ্যালবোপিকটাস এবং বিয়াল্লিশ শতাংশ ইজিপ্টাই মশা পাওয়া গিয়েছিল। স্বাভাবিক প্রকৃতি অনুযায়ী ইজিপ্টাই পঁচান্ন ভাগ জীবাণুবাহী হলেও অ্যালবোপিকটাস মাত্র পাঁচ ভাগ জীবাণুবাহী হয়ে থাকে।
এই বৈপরীত্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার জানান যে, এই দুই প্রজাতির মশার ক্ষেত্রে জীবাণুর পরিমাণের যে সাধারণ ধারণা রয়েছে তা মূলত বৈদেশিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। হয়তো বর্তমান সময়ে অ্যালবোপিকটাস প্রজাতিটি আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে জীবাণুবাহী হয়ে উঠেছে এবং এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত ও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। দেশব্যাপী চলমান এই সংকটে উপকূলীয় উনিশ জেলায় মৃত্যুর যে একশত সতেরো জনের হিসাব পাওয়া গেছে, তা বিবেচনা করলেও মোট মৃত্যুর প্রায় চৌত্রিশ শতাংশই ঘটছে এই উপকূলীয় অঞ্চলে।
Daily Diner Alo