ঢাকা | বঙ্গাব্দ

টিউশনির অল্প অর্থে শুরু করা সুমাইয়ার কৃত্রিম ফুলের ব্যবসা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 20, 2026 ইং
টিউশনির অল্প অর্থে শুরু করা সুমাইয়ার কৃত্রিম ফুলের ব্যবসা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

ময়মনসিংহের বিখ্যাত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন উদ্যানের নির্দিষ্ট সীমানায় বিভিন্ন বয়সি মানুষ ভিড় করছেন। কেউ পণ্যের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখছেন, কেউ দাম জানতে আগ্রহী, আবার কেউ সঙ্গে সঙ্গেই কিনে নিচ্ছেন। এই চত্বরের এক কোণায় পসরা সাজিয়ে বসে সুমাইয়া আক্তার (ইলমা) নামের এক তরুণী কৃত্রিম ফুলের তোড়া বিক্রি করছেন। নরম ও চিকন ধাতব তারের ওপর মখমল বা তুলার মতো ফাইবার জড়ানো পাইপ ক্লিনার দিয়ে এসব ফুল তৈরি করা হয়েছে। দেখতে একেবারে আসল ফুলের মতো হলেও এগুলো সহজে নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না এবং সঠিক যত্নে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

অনলাইনভিত্তিক মাধ্যমে নিজের হাতে তৈরি পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন চব্বিশ বছর বয়সি সুমাইয়া। সাধারণ মানুষ সরাসরি তাঁর পণ্যের প্রতি কেমন আগ্রহ দেখান, তা স্বচক্ষে যাচাই করতে গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো তিনি উদ্যানে গিয়ে এই ফুলের তোড়া নিয়ে বসেন। শুরুর দিকে তাঁর মনে কিছুটা সংশয় কাজ করলেও ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় এখন এই তরুণ উদ্যোক্তার বুকভরা আশা।

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভালুকা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা সুমাইয়া। তিনি এ বছর গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে সমাজকর্মে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন সম্পন্ন করেছেন। গত ২০২৪ সালে তাঁর বিয়ে হয় এবং তাঁর স্বামী বাহার উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্বামীর সঙ্গে বর্তমানে তিনি ত্রিশালে বসবাস করছেন। দৈনন্দিন সংসারের কাজ, একাডেমিক পড়াশোনা এবং টিউশনি করার পাশাপাশি অবসর সময়ে তিনি এই ফুলের তোড়াগুলো তৈরি করেন।

২০২১ সালের শেষপ্রান্তে এসে সুমাইয়ার একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলা শুরু হয়। টিউশনি করে পাওয়া মাত্র ১ হাজার ৯০০ টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি হস্তশিল্পের নানা কাজ শুরু করেন। গোড়ার দিকে তিনি ছবি আঁকা এবং ক্যানভাস পেইন্টিংয়ের কাজ করতেন। পরবর্তীতে কাপড়ে হাতে নকশা করা পাঞ্জাবি, শাড়ি, ফটোফ্রেম ও শুভেচ্ছা কার্ড বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনলাইন পেজে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর এই ফেসবুক পেজটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ইলমা রাফটস’।

ফুলের তোড়া তৈরির অভিনব কাজ হাতে নেওয়ার পর থেকে সুমাইয়া আর আগের মতো অন্য কোনো হস্তশিল্পের কাজ করেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের অনলাইন পণ্য বাজারে আরও অনেকে বিক্রি করে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁর তৈরি করা হস্তশিল্পের বিক্রিও বেশ কমে যায়। ফলে তিনি কিছুটা আলাদা ধরনের কিছু তৈরি করার পরিকল্পনা করেন। বর্তমানে সমস্ত খরচ বাদে কেবল এই তোড়াগুলো বিক্রি করেই তাঁর প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

গত আট-নয় মাস ধরে সুমাইয়া এই বিশেষ পাইপ ক্লিনার দিয়ে নানা ধরনের আকর্ষণীয় নকশার ফুল বানিয়ে চলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ফুল তৈরির বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ দেখার পরেই তাঁর মনে দারুণ আগ্রহের জন্ম হয়। তিনি ছোট, মাঝারি এবং বড়—এমন বিভিন্ন মাপের ফুলের তোড়া তৈরি করে থাকেন। এমনকি ক্রেতাদের নিজ পছন্দ অনুযায়ী নির্দিষ্ট রঙের ও নকশার তোড়াও বানিয়ে দেন তিনি।

নিজের এই কাজের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে সুমাইয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর চারুকলা ও কারুশিল্পের প্রতি তীব্র অনুরাগ ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে চাওয়া ছিল যে পড়াশোনা শেষ করে তিনি যেন একটি চাকরি করেন। তবে এই সৃজনশীল কাজের প্রতি তাঁর নিজস্ব টান প্রবল। তাই পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি এই উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখার ঐকান্তিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই ফুলগুলো তৈরির মূল কাঁচামাল হলো পাইপ ক্লিনার। সুমাইয়া জানান, চীন ও দেশের বাইরে থেকে অনলাইনে বিভিন্ন বিক্রেতা এই উপকরণগুলো দেশে নিয়ে আসেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি এই কাঁচামালগুলো সংগ্রহ করেন। এর পাশাপাশি ফ্লোরাল টেপ, সুদৃশ্য ফিতা এবং মোড়ানোর কাগজের প্রয়োজন হয়। প্রায় আট ইঞ্চি লম্বা এবং নয় মিলিমিটার পুরু একটি পাইপ ক্লিনারের দাম দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত পড়ে।

একটি বড় আকৃতির তোড়া তৈরি করতে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মতো উপকরণ লাগে। নকশার ওপর নির্ভর করে এটি বানাতে সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টা কিংবা কখনো তার চেয়েও বেশি সময় ব্যয় হয়। এমন একটি তোড়া বাজারে প্রায় এক হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়ে থাকে। সুমাইয়ার তৈরি করা এসব তোড়ার সর্বনিম্ন দাম শুরু হয় ৮০ টাকা থেকে। এমনকি কিছুদিন আগে তিনি তিন হাজার টাকা মূল্যের একটি বড় তোড়াও বিক্রি করেছেন। তবে নিয়মিত কাজ করার সুযোগ না থাকায় বর্তমানে বিক্রির পরিমাণ কিছুটা সীমিত রয়েছে।

এই ব্যবসায় নেমে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসম্মত কাঁচামালের পাইকারি বাজার খুঁজে বের করা। সুমাইয়ার ভাষ্য, অনেকেই খুচরা বিক্রি করেন, কিন্তু ভালো মানের উপকরণ কম মূল্যে কোথায় পাওয়া যাবে, তা খুঁজে পেতে তাঁর বেশ কষ্ট পোহাতে হয়েছে। এখনও পড়াশোনা, টিউশনি এবং সংসারের যাবতীয় কাজ শেষ করে দুপুর গড়িয়ে বিকেল কিংবা রাতে সময় বের করে তিনি কাজ করেন।

তাঁর স্বামী বাহার উদ্দিনও সব সময় সুমাইয়ার পাশে পরম সহযোগিত হয়ে আছেন। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্যাকেজিং পর্যন্ত নানা কাজে তিনি স্ত্রীকে সাহায্য করে থাকেন। বাহারের মতে, অতীতে সুমাইয়া কাপড়ে নকশা করা পাঞ্জাবি বানিয়ে অনলাইনে বিক্রি করত। পরবর্তীতে ভিডিও দেখে সে সম্পূর্ণ নতুন এই কাজ শিখে নিয়েছে। এই কাজটি চমৎকার। নিজের অবসরের সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সে একটি নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এভাবে লেগে থাকলে ভবিষ্যতে সে আরও ভালো কিছু করতে পারবে।

প্রাকৃতিক তাজা ফুল মাত্র কয়েক দিনেই নেতিয়ে পড়ে শুকিয়ে যায়, কিন্তু পাইপ ক্লিনারে তৈরি এই কৃত্রিম ফুল যথাযথ যত্নে দীর্ঘকাল সতেজ থাকে। এমনকি ময়লা জমে গেলে পানি ও সাবান দিয়ে সহজেই এগুলো পরিষ্কার করা সম্ভব। সুমাইয়া আরও বলেন, পড়াশোনা ও পারিবারিক সব দায়িত্ব সামলে তিনি এই কাজটিও নিজের মতো করে এগিয়ে নিতে চান। তাঁর মতো অনেক নারী ও তরুণ এমন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন, যাঁদের দেখে তিনি দারুণ উৎসাহ পান। নিয়মিত কাজ চালিয়ে যেতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে তাঁর এই উদ্যোগটি আরও বড় করতে পারবেন বলে তাঁর জোরালো প্রত্যাশা রয়েছে।

এদিকে উদ্যানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সাবিহা বিনতে জামান ও নীলা নৌরিন পরম আগ্রহ নিয়ে ফুলগুলো হাতে নিয়ে দেখছিলেন। তাঁদের অভিমত, ফুলগুলো দেখতে অত্যন্ত চমৎকার। তাজা ফুল অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যায়, অথচ এর চেয়ে কাছাকাছি দামের এই কৃত্রিম ফুলগুলো ঘরে বেশ লম্বা সময় পর্যন্ত সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা সম্ভব হবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
৪৬০০ পদের আরআরএফ নিয়োগে পরীক্ষা আম্বরখানায়

৪৬০০ পদের আরআরএফ নিয়োগে পরীক্ষা আম্বরখানায়