ঢাকা | বঙ্গাব্দ

মেট্রোরেলে প্রবীণ শিক্ষকের মৃত্যু, সিট মেলেনি অনুরোধেও

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2026 ইং
মেট্রোরেলে প্রবীণ শিক্ষকের মৃত্যু, সিট মেলেনি অনুরোধেও ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা

রাজধানীর জনবহুল মেট্রোরেলে অতিরিক্ত ভিড়ের মাঝে অসুস্থ হয়ে ৬৪ বছর বয়সি এক শিক্ষকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নিহত ওই প্রবীণ শিক্ষকের নাম নজীবুর রহমান, যিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২৪ অক্টোবর বিকেলে ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় দেশজুড়ে নানান আলোচনা ও প্রতিবেশীদের মাঝে গভীর সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত শিক্ষক নজীবুর রহমান ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ঘটনার দিন সকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং অনুষ্ঠান শেষে বেলা তিনটার দিকে রাজধানীর শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক শিক্ষকও সহযাত্রী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

ছুটির আমেজ ও নানা কারণে ওই দিন মেট্রোরেলের বগিগুলোতে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। কোনো খালি আসন না পাওয়ায় দুই শিক্ষকই ভেতরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন। যাত্রীদের প্রবল ঠেলাঠেলি ও ভিড়ের চাপে একপর্যায়ে তাঁদের দুজনের মাঝে শারীরিক দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় এবং চারপাশের ভিড়ে তাঁরা কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

যাত্রাটি যখন শেওড়াপাড়া এলাকার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন বেলা আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে মাত্রাতিরিক্ত ভিড় ও ঠেলাঠেলির মধ্যে অধ্যাপক নজীবুর রহমান গুরুতর অসুস্থতা অনুভব করতে থাকেন। বসার আসনের দিকে তাকিয়ে তিনি বসার জন্য যাত্রীদের কাছে একাধিকবার মৌখিক অনুরোধ জানান, যাতে তাঁকে একটু বসার সুযোগ দেওয়া হয়।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সিটে বসে থাকা যাত্রীদের কেউই তাঁর সেই আকুতিতে ন্যূনতম সাড়া দেননি। প্রবীণ এই শিক্ষকের এই আহাজারি ও অনুরোধ কেউ আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁর সন্তান। এই ঘটনার মাত্র এক থেকে দুই মিনিটের ব্যবধানে তিনি চলন্ত মেট্রোর মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন ও অজ্ঞান হয়ে যান।

আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্য সাধারণ যাত্রীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে মেঝে থেকে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। ওই সময় চারপাশের শোরগোল ও হট্টগোল শুনে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা সহকর্মী শিক্ষকও দ্রুত ছুটে আসেন এবং অন্যদের সহযোগিতায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন।

অন্যান্য যাত্রীদের সাহায্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তাঁরা বুঝতে পারেন যে নজীবুর রহমান আর বেঁচে নেই। নাকিবুর রহমানের জোরালো ধারণা অনুযায়ী, মেট্রো গাড়ির ভেতরে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই তাঁর সম্মানিত বাবার প্রাণপাখি উড়ে গিয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মৃত শিক্ষকের ছেলে নাকিবুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উত্তরা উত্তর স্টেশনে ট্রেন পৌঁছানোর পর যাত্রীদের সহযোগিতায় আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ দ্রুত ফোন করা হয়।

জরুরি ফোনের পর অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাঁকে দ্রুত উত্তরার স্থানীয় ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে দুঃসংবাদ পেয়ে নাকিবুর নিজেও ছুটে যান এবং বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অধ্যাপক নজীবুরের শেষ বিদায়ের এই বেলার সময়ে পরিবারের কোনো নিকট সদস্যই তাঁর পাশে উপস্থিত থাকতে পারেননি। নাকিবুর জানান, তাঁর মা ও ছোট ভাই সে সময় পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন এবং বিমান টিকিট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁরা সময়মতো দেশে ফিরতে পারেননি।

এ ছাড়া তাঁর বোন সপরিবারে সুদূর নিউজিল্যান্ডে বসবাস করেন এবং তাঁর আরেক ভাইও বিদেশে পড়াশোনার কাজে ব্যস্ত আছেন। ফলে পরিবারের কোনো সদস্যই তাঁর এই শেষ মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেননি। নিকটাত্মীয়দের অনুপস্থিতিতেই তাঁকে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

বাবার এই মর্মান্তিক পরিণতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাকিবুর রহমান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি কোনো ধরনের ক্ষোভ বা সরাসরি দোষারোপ করতে চাননি। তিনি অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে উল্লেখ করেন যে এই ধরনের সংকটময় পরিস্থিতিতে যেকোনো মানুষই পড়তে পারেন এবং বয়স্ক নাগরিকদের প্রতি সমাজের সকলের আরও বেশি সহানুভূতিশীল ও বন্ধুসুলভ আচরণ করা উচিত।

ছেলের মনে এই নিয়ে আজীবন একটি সুপ্ত বেদনা ও আক্ষেপ রয়ে যাবে যে, যদি সেদিন বসা যাত্রীদের মধ্য থেকে কেউ একটু দয়া করে তাঁর বয়স্ক বাবাকে বসার সুযোগ করে দিতেন, তবে হয়তো তাঁকে এভাবে নিচে পড়ে প্রাণ হারাতে হতো না। তিনি হয়তো কারও কাঁধে বা কোলে মাথা রেখে একটু নিরাপদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারতেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Daily Diner Alo

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শিক্ষা সূচকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় সাফল্য

শিক্ষা সূচকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় সাফল্য