নিজস্ব প্রতিবেদক দিনের আলো পত্রিকা
গ্রামীণ পরিবেশে শৈশব থেকেই কৃষিকাজের ওপর গভীর অনুরাগ ছিল লেখকের। বাপ-দাদার চৌদ্দগোষ্ঠী চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, তাঁর বাবা ছিলেন পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ঔপনিবেশিক আমলে এলাকায় নীলচাষের বিস্তারের ফলে কৃষকদের ওপর সীমাহীন নিপীড়ন ও অত্যাচার নেমে আসে। স্থানীয় জমিদারদের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নির্যাতন মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ায়, দাদারা সিদ্ধান্ত নেন বাবাকে পুলিশ বাহিনীতে যুক্ত করার। তৎকালীন পুলিশ বাহিনীতে তাঁর দৈহিক গঠন ও শারীরিক অবয়ব চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
সরকারি চাকরি করার সুবাদে দীর্ঘ ত্রিশ বছর কর্মজীবনে বাবা কখনোই চাষবাস থেকে দূরে সরে যাননি; এমনকি অবসর গ্রহণের পরও জমিজমার সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ অটুট ছিল। কৃষি পেশাটি তাঁর কাছে নিছক জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য ও জীবনদর্শনের এক অপরিহার্য অংশ। প্রায় দুই দশক আগে মাতা-পিতা উভয়ই পরলোকগমণ করলেও, তাঁরা প্রবাসে অবস্থান করায় দেশের জমিতে চাষাবাদ আজও অব্যাহত রয়েছে। তবে জমির ভোগদখল নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ লক্ষ্য করা গেলেও পর্যাপ্ত সময় ও গুরুত্বের অভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে লাভের বিষয় নয়, বরং এর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং মর্যাদা রক্ষা করা উত্তরসূরিদের নৈতিক দায়িত্ব।
বর্তমান আবাসস্থল সুইডেনে অবসরের সময়টুকু কৃষিকাজে ব্যয় করেন এবং বেশ কয়েক বছর ধরে দেশীয় শাকসবজি আবাদ করে আসছেন। অত্যন্ত চমকপ্রদ বিষয় হলো, শীতপ্রধান এই দেশটিতেও গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের শাকসবজি ফলানো সম্ভব হচ্ছে, যা তাঁকে দারুণভাবে উৎসাহিত করে। উদ্ভিদের প্রতি ভালোবাসা, নতুন প্রযুক্তি ও পরিমিত পরিশ্রম প্রয়োগ করলে বরফের দেশেও এক ধরনের কৃষিবিপ্লব ঘটানো অসম্ভব কিছু নয়। তাঁর বাগানে লাউয়ের আবাদ দারুণ সাড়া ফেলেছে এবং অনেক সুইডিশ নাগরিকও এখন নিজেদের বাড়ির আঙিনায় লাউ চাষ শুরু করেছেন। বিদেশি উচ্চারণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তিনি সবজিটিকে লাউ নামেই পরিচিত করে তুলেছেন, যা ধীরে ধীরে ভিনদেশি মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বাগানের পাশেই রান্নার সুব্যবস্থা থাকায় দেশীয় শাকসবজি দিয়ে সেখানে সুস্বাদু পদ তৈরি করা হয়। উন্মুক্ত প্রান্তরে সবাই মিলে একত্রে বসে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হয়। পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি, তাজা সবজি, রান্নার সুবাস এবং যৌথ ভোজন তাঁকে বারবার শৈশবের গ্রামীণ দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও নিজস্ব শেকড়ের সঙ্গে মেলবন্ধন অটুট রাখা সম্ভব। কিছুদিন আগে লাউ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল একটি বিশেষ পদ, যার নাম দুধকদু। আঞ্চলিক পর্যায়ে এর অন্য কোনো নাম আছে কি না তা অজানা হলেও, এর রন্ধনপ্রণালী অত্যন্ত সহজ। কুচি করে কাটা লাউয়ের সঙ্গে গরুর দুধ, নারিকেলের দুধ, খেজুরের মিষ্টি কিংবা চিনি, চালের সুজি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়।
প্রস্তুতকরণের পর এটি এক চমৎকার মিষ্টান্নে রূপ নেয়। উপস্থিত সকলে সেটি আহার করে অমৃততুল্য বলে প্রশংসা করেন। দেশীয় সবজির বৈশিষ্ট্য, দুধের সুবাস, নারিকেলের মিষ্টতা এবং খেজুর গুড়ের ঘ্রাণ একত্রে মিশ্রিত হলে এই পদের সুস্বাদু হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আহার পর্ব সমাপ্ত হতেই সবার মনে কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে যে, রান্না করার পূর্বে যার নাম লাউ ছিল, তা পাক করার পর কীভাবে কদুতে রূপান্তরিত হলো। বিষয়টি নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও, কথা শেষ হওয়ার আগেই স্ত্রী মারিয়া হঠাৎ মন্তব্য করে বসেন যে, যে লাউ সেই কদু। এমন একটি পরিচিত বাংলা প্রবাদ তিনি যথাযথ সময়ে ও স্থানে প্রয়োগ করায় লেখক দারুণভাবে বিস্মিত হন।
এর পেছনের ইতিহাস অনুসন্ধান করে একটি মধুর স্মৃতির কথা জানা যায়। ১৯৯৫ সালে মারিয়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে লেখকের মা নিজ হাতে দুধকদু রান্না করে খাইয়েছিলেন। খেজুর রসের সঙ্গে দুধ মিশিয়ে চিতই পিঠা পরিবেশন, দুধকদু রান্না এবং সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো মারিয়ার স্মৃতিপটে আজও উজ্জ্বল। সুদীর্ঘ বছর পর সুইডেনের মাটিতে একই পদের স্বাদ গ্রহণ করে সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মা আজ জীবিত না থাকলেও তাঁর হাতের রান্নার স্মৃতি, আতিথেয়তা ও ভালোবাসা আজও পরিবারে বিদ্যমান। ভিনদেশের কোনো মানুষের অন্তরে একজন মায়ের হাতের রান্নার পদ এতটা গভীর স্থান দখল করে আছে তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।
গল্পটির মূল সৌন্দর্য এখানেই নিহিত। একটি খাদ্য কেবল ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটায় না, বরং মানুষকে অতীতের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে আপন করে তোলে এবং দূরত্বের প্রাচীর ভেঙে সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে। মায়ের তৈরি দুধকদু তাই মারিয়ার নিকট নিছক কোনো খাবার নয়, বরং বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক পরিচয়ের এক জীবন্ত দলিল। মারিয়ার উচ্চারিত সেই প্রবাদটি লেখককে ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবতে শিখিয়েছে। একই বস্তুকে মানুষ বিভিন্ন নামে অভিহিত করে, নানা ভাষায় প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে তার তাৎপর্য আবিষ্কার করে থাকে। কিন্তু নামের ভিন্নতা সব সময় মূল বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে না। লাউ ও কদুর এই বর্ণনায় যেমন হাস্যরস রয়েছে, তেমনি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে অনুধবনের সহজ পাঠও রয়েছে।
বর্তমান সমাজে এমন বহু অনৈক্য বিরাজ করে যার দরুন মানুষ অনাবশ্যকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অঞ্চল, ভাষা, সামাজিক পরিচয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা জীবনযাত্রার ধরন মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। অথচ পারস্পরিক ব্যবধান বোঝার চেষ্টা করলে তার ভেতরেও সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া অবাস্তব নয়। তবে এই উপলব্ধির অর্থ এই নয় যে সমস্ত অমিল অবহেলা করতে হবে। ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য এবং সততা ও অসততার তফাত অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে ব্যবধান কমানো সম্ভব, সেখানে বিভেদ বাড়িয়ে কোনো কল্যাণ নেই।
ব্যক্তিগত জীবন থেকেও অনুরূপ শিক্ষা লাভ করেছেন লেখক। বাংলার পল্লী অঞ্চলে চাষবাসের মাধ্যমে যে জীবনের সূচনা হয়েছিল, সুইডেনের মাটিতেও তিনি সেই কৃষিকাজের মাঝেই আনন্দ খুঁজে পান। দেশান্তরিত হয়েছে, পারিপার্শ্বিকতা বদলে গেছে, কিন্তু ভূমির প্রতি অনুরাগ অপরিবর্তিত রয়েছে। পিতা সরকারি চাকরি করেও যেমন কৃষি আঁকড়ে ধরেছিলেন, তিনিও প্রবাসে বসে সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। এটি মূলত এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চালিত সম্পর্কের একটি ধারাবাহিকতা। এই ধারাবাহিকতার ভেতরে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা নিহিত রয়েছে। কৃষিকে অবহেলা করে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং গ্রামীণ কাঠামোর শক্ত ভিত্তি নিশ্চিত করতে পারে না। কৃষি কেবল অতীত ঐতিহ্যই নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও উৎস। জ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগের যথাযথ সমন্বয় ঘটাতে পারলে জাতীয় কৃষি আরও উৎপাদনশীল, আধুনিক ও মর্যাদাবান হয়ে উঠতে সক্ষম।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
Daily Diner Alo